অপেক্ষা পালা শেষ। এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে লাল-সুবজের বাংলাদেশ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে দেশের নাগরিকরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত বিভিন্ন সংস্কার প্যাকেজের ওপর তাদের মতামত দেবেন ‘গণভোট’-এর মাধ্যমে। সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে জাতীয় সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোট উপলক্ষে দেশজুড়ে এখন উৎসব ও টানটান উত্তেজনার আমেজ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যা গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হচ্ছে; শুধুমাত্র শেরপুর-৩ আসনের প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে সেখানে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। এবার, ২,০৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে ২৭৫ জন স্বতন্ত্র।
বরাবরের মতো এবারও বড় শক্তি হিসেবে মাঠে আছে বিএনপি (২৯১ প্রার্থী)। এছাড়া উল্লেখযোগ্য লড়াইয়ে আছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (২৫৮), জামায়াতে ইসলামী (২২৯) এবং জাতীয় পার্টি (১৯৮)। নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয় নাগরিক পার্টি ৩২টি আসনে তাদের ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে লড়ছে।
এবারের নির্বাচন ভোটার সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম। মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। পুরুষ ভোটার ৬.৪৮ কোটি এবং নারী ভোটার ৬.২৮ কোটি। তৃতীয় লিঙ্গের ১,২২০ জন ভোটারও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সারাদেশে ৪২,৭৭৯টি কেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজারের বেশি ভোটকক্ষে ভোট নেওয়া হবে।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো মানুষবিহীন আকাশযান বা ইউএভি’র ব্যবহার। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এসব ড্রোন আকাশ থেকে সরাসরি ‘লাইভ ফিড’ প্রদান করবে। বিমানবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ড্রোনগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক দিকনির্দেশনা দেবে। সেই অনুযায়ী দ্রুত সাড়া দিবে আইন-শৃংখলাবাহিনী।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মিলিয়ে মাঠে থাকবেন প্রায় ৯ লাখ সদস্য। এর মধ্যে মূল দায়িত্বে থাকবেন পুলিশ ও আনসারের সাত লাখের বেশি সদস্য। সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে দায়িত্ব পালন করবেন ১ লাখ ৩ হাজার সেনাসদস্য।
পাঁচ জেলার ১৭ আসনে বিশেষ নজরদারিতে থাকবেন ৫ হাজার নৌবাহিনী ও ৩ হাজার ৫০০ বিমানবাহিনীর সদস্য। সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করবে বিজিবি ও কোস্টগার্ড।
নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের কৌতূহল মেটাতে এবার বিপুল সংখ্যক পর্যবেক্ষক থাকছেন। দেশি ৮১টি পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রায় ৫৫,৪৫৪ জনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে আসা প্রায় ৫০০ জন পর্যবেক্ষক সরাসরি ভোটকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করবেন।
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ভোটাররা একটি ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে প্রস্তাবিত রাষ্ট্রীয় সংস্কারগুলোর অনুমোদন দেবেন। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়, যেখানে সরাসরি জনগণের সম্মতিতে সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ জেন-জি ভোটার এবারের নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণী ফ্যাক্টর হতে পারে। জুলাই ২০২৪-এর বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া এই তরুণ প্রজন্ম একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার প্রত্যাশায় কেন্দ্রে উপস্থিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির আবহে আগামীকাল বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের ফলাফল কেবল নতুন সরকার গঠনই করবে না, বরং আগামী কয়েক দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।






















