দীর্ঘ ১৮ মাসের দায়িত্ব পালন শেষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাত সোয়া ৯টায় দেওয়া এই ভাষণে তিনি গত দেড় বছরের অর্জন, সংস্কার কার্যক্রম এবং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে একটি নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেন।
মঙ্গলবার নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে তিনি দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান।
ভাষণের শুরুতেই ড. ইউনূস পাঁচ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে বলেন, সেদিন কী মহা মুক্তির দিন ছিলো! দৈত্যের গ্রাস থেকে তরুণ ছাত্রছাত্রীরা দেশকে বের করে এনেছে। দেশ মুক্ত হলেও সম্পূর্ণ অচল ছিলো। ১৮ মাস আগে যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি—শুরু করেছি মাইনাস থেকে।
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা তার মেয়াদে নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজের খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি বলেন আইন ও নির্বাহী আদেশে প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী এবং ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে, যার ৮৪ শতাংশ বাস্তবায়িত।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন এবং বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করতে আলাদা সচিবালয় গঠন করা হয়েছে। গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
পাচার হওয়া ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের ধাক্কা সামলে রিজার্ভ বর্তমানে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে বলেও জানান প্রফেসর ইউনূস।
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে কৌশলগত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ড. ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড়ো অর্জন ‘জুলাই সনদ’। এটি বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
তিনি সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘উৎকৃষ্ট উদাহরণ’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও নিপীড়নের ইতিহাস সংরক্ষণে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে ‘জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন তিনি। তিনি দেশবাসীকে সপরিবারে এই জাদুঘর পরিদর্শনের অনুরোধ জানান।
নির্বাচিত সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যারা জয়ী হয়েছেন তারা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন, বাকি অর্ধেক পেয়েছেন অন্যরা। আমি আশা করি, নতুন সরকার জনগণের এই আস্থার মর্যাদা রাখবে।
ভাষণের শেষে ড. ইউনূস আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার সার্বিক দায়িত্ব আমাদের সবার। গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও বাকস্বাধীনতার যে ধারা শুরু হয়েছে, তা যেন কখনো থেমে না যায়।


















