ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা না দেওয়ার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডেকেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। রোববার সকাল ৮টা থেকে তারা এ কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন। এবার জেটি, ইয়ার্ড, টার্মিনাল, প্রশাসনিক ভবনের পাশাপাশি বহির্নোঙরে (আউটার লাইটারেজ) পরিচালন কাজ বন্ধ থাকবে। আগের ধর্মঘটে বহির্নোঙরে কার্যক্রম সচল ছিল। এ কর্মসূচিতে উদ্বেগ জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ২০০ সাধারণ কর্মচারী ও শ্রমিককে রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় বন্দর ভবনের সম্মেলন কক্ষে জরুরি সভায় উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা এটি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
গতকাল শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কর্মসূচি ঘোষণা করেন বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন। বন্দর রক্ষা পরিষদের বাকি তিনটি দাবি হচ্ছে– চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানকে প্রত্যাহার, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল এবং শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি আট ঘণ্টা করে এবং ৩ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল পর্যন্ত টানা কর্মবিরতি পালন করেছেন তারা। নৌ উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের আশ্বাসে দুদিনের জন্য (শুক্রবার ও শনিবার) কর্মসূচি স্থগিত করেন। উপদেষ্টা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় এবার আওতা বাড়িয়ে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে।
এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির, ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন, সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, কার্যকরী সভাপতি আবুল কাশেম, মার্চেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ক ইয়াসিন রেজা রাজু, জাহিদ হোসেন, মো. হারুন, উইন্সম্যান সমিতির ইমাম হোসেন খোকন, শরীফ হোসেন ভুট্টো প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
জরুরি সভা শ্রমিকদের প্রত্যাখ্যান
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বিভাগের শ্রমিক ও কর্মচারীদের নিয়ে রোববার জরুরি সভা ডেকেছে। তবে শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, শ্রমিকরা এ সভায় বসতে রাজি নয়।
গত শনিবার ইস্যু করা চিঠিতে দেখা যায়, বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ২০০ সাধারণ কর্মচারী ও শ্রমিককে রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় বন্দর ভবনের সম্মেলন কক্ষে সভায় উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীমের সই করা চিঠিতে সব বিভাগীয় প্রধানকে কোটা অনুযায়ী শ্রমিকদের অংশ নিতে জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বিভাগভিত্তিক উপস্থিতির লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। পরিবহন বিভাগ ৫০ জন, মেকানিক্যাল ৮০, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও প্রকৌশল থেকে ২০ জন করে, অর্থ ও হিসাব ১৫, পরিদর্শন বিভাগ থেকে ৫ জন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক শাখা থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক প্রতিনিধি থাকবেন। এ ছাড়া প্রধান কল্যাণ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন ক্যাটেগরি থেকে আরও ১০০ জন মনোনীত শ্রমিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাধারণ কর্মচারী ও শ্রমিকদের সঙ্গে ‘জরুরি বিষয়’ নিয়ে আলোচনার জন্য এই সভা ডাকা হয়েছে। এই আদেশ কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সভার নিরাপত্তায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য সংস্থাকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে।
তবে কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগকে প্রত্যাখ্যান করে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা এই সভায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সব শ্রমিক-কর্মচারীকে সভায় যোগ না দেওয়ার কথা জানিয়েছি। এই জরুরি সভা এমন এক সময়ে ডাকা হয়েছে, যখন অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। এটি কর্মসূচি বানচালের অপকৌশল।’
বন্দর নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক প্রথম সহসভাপতি এম এ সালাম বলছেন, ‘বন্দরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকা জাহাজগুলোতে অন্তত ৫০ লাখ টন পণ্য আছে। এসব জাহাজের বেশ কয়েকটিতে পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আছে। ডিপোতে আমাদের রপ্তানি কনটেইনার জমেছে ১৪ হাজারের বেশি। এখন আবার লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। অপূরণীয় ক্ষতির মুখে আমরা।’
সি কম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘যে কোনো মূল্যে বন্দর সচল রাখার ওপর মনোযোগ দেওয়া উচিত সব পক্ষের। ভোটের আগে এমন কর্মসূচি অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।’ তিনি জানান, বন্দর ও ডিপোতে যে জট লেগেছে, সেটি সারতে লাগবে অন্তত ১৫ দিন। এর মধ্যে আবার নতুন ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। এসব পণ্য আর রমজানের আগে খালাস করতে পারবেন না ব্যবসায়ীরা।
প্রধান উপদেষ্টা বরাবর খোলা চিঠি
জাতীয় নির্বাচনের আগে বন্দরের সংকট নিরসন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। তারা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে খোলা চিঠি দিয়েছেন। শনিবার দেওয়া ওই খোলা চিঠিতে তারা আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান করতে প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ জানান।
ব্যবসায়ীরা চিঠিতে লিখেছেন, আমদানি-রপ্তানিনির্ভর বন্দরে সাম্প্রতিক অচলাবস্থায় শিল্প ও বাণিজ্যে গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এমন পরিস্থিতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এনসিটি নিয়ে সৃষ্ট সংকটের জেরে বন্দরে জাহাজ চলাচল ও পণ্য খালাস কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে না পারায় উৎপাদন কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। রপ্তানি পণ্য বিদেশে পাঠানো অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কনটেইনার এবং ৭৫ শতাংশ সমুদ্রপথের বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। বন্দরের অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে পোশাক, টেক্সটাইল, ওষুধ, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে রমজান সামনে রেখে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। বন্দরে জাহাজজট ও কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় আমদানিকারকদের বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ, বন্দর ফি ও গুদাম খরচ গুনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ পড়বে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় কমে গিয়ে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এই খোলা চিঠিতে সই করেছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।


















