শুক্রবার , ৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
  1. London Mirror Specials
  2. অন্যান্য
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আবহাওয়া
  6. খুলনা
  7. খেলা
  8. চট্রগ্রাম
  9. জেলার খবর
  10. ঢাকা
  11. তথ্য-প্রযুক্তি
  12. প্রবাসের কথা
  13. বরিশাল
  14. বাংলাদেশ
  15. বিনোদন

উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশিদের বিদেশযাত্রা কঠিন হচ্ছে

প্রতিবেদক
Newsdesk
জানুয়ারি ৯, ২০২৬ ১:১৪ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেতে ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নানা জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সীমিত করেছে।

সম্প্রতি অস্ট্রেলীয় সরকারও বাংলাদেশিদের জন্য অ্যাসেসমেন্ট লেভেলে পরিবর্তন এনেছে; ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার পথ অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী হতে চলছে। এর আগে ইউরোপের বহু দেশও বাংলাদেশের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

ইউরোপের ‘অর্থনৈতিক ইঞ্জিন’ খ্যাত জার্মানির ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূতও ‘জালিয়াতিপূর্ণ নথি’র বিষয়টি সামনে এনেছেন। বলেছেন, বাংলাদেশিরা প্রচুর ভুয়া তথ্য ও কাগজ দেয়।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বহু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অন্য দেশে পাড়ি জমান। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলোই শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের পাশাপাশি জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশেও যান বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা।

তবে, বিদেশে গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা, ভুয়া ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে আবেদন, অনেক দেশের নিজস্ব পরিকল্পনায় পরিবর্তনসহ নানা কারণে বাংলাদেশিদের ভিসা আবেদন বাতিল বা ভিসা রিজেকশন হওয়ার সংখ্যা বেড়েছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল এ বিষয়ে অবগত থাকলেও উল্লেখযোগ্য কোনো প্রচারণা বা কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি। সম্প্রতি ভিসা প্রত্যাহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন বলেছেন, কোন দেশ কাকে ভিসা দেবে সেটা তাদের নিজস্ব এখতিয়ার। কিন্তু বাংলাদেশিদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের মূল কারণ জাল তথ্য দিয়ে আবেদন।

তিনি বলেন, একজনের মিথ্যা তথ্য দেওয়ার জন্য বাকিদেরও সমস্যা হয়। মিশনগুলো যখন দেখে বাংলাদেশিরা জাল তথ্য দিয়ে আবেদন করছে। তখন ত্রুটিপূর্ণ আবেদনগুলো নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় লাগছে। ভুয়া নিয়োগপত্র দাখিলের কারণে ভিসা প্রত্যাহারের হার আগের চেয়ে বাড়ছে।

‘আমাদের ব্যর্থতা হচ্ছে, আমরা জাল সনদে আবেদনকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে পারছি না। জাল তথ্য প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারলে ভালো হতো।’

এদিকে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার মানচিত্র ২০২৬ সালে এক নজিরবিহীন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে শুরু করেছে। এক সময়ের অবাধ সুযোগ মিললেও এখন কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া ও চাহিদা ব্যবস্থাপনার বেড়াজালে আবদ্ধ হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য এই পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৮ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অফ হোম অ্যাফেয়ার্স তাদের ভিসা ক্যাটাগরিতে যে পরিবর্তন এনেছে, তা একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রবণতারই অংশ। অস্ট্রেলীয় সরকার তাদের ‘সিম্পলিফাইড স্টুডেন্ট ভিসা ফ্রেমওয়ার্ক’ -এর আওতায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অ্যাসেসমেন্ট লেভেল পুনর্নির্ধারণ করেছে।

1

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশকে অ্যাসেসমেন্ট লেভেল ১ ( AL 1) থেকে সরাসরি অ্যাসেসমেন্ট লেভেল ৩ (AL 3) -এ নামিয়ে আনা হয়েছে। এটি কেবল একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন নয়, বরং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলীয় ভিসার পথকে অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী করে তোলার একটি প্রশাসনিক সংকেত।

অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে ক্রমবর্ধমান সততা বিঘ্নিত হওয়ার কারণেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে ভুয়া আর্থিক নথি ও একাডেমিক তথ্যের ব্যাপক প্রসারের ফলে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের সুযোগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

2

লেভেল ৩-এ চলে যাওয়ার অর্থ হলো, এখন থেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনের সময় আর্থিক সক্ষমতা ও ইংরেজি ভাষার দক্ষতার কঠোর প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। লেভেল ১-এ থাকাকালীন শিক্ষার্থীরা যে ‘স্ট্রিমলাইন্ড’ বা সহজতর সুবিধা পেতেন, তা এখন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে।

এদিকে শুধু অস্ট্রেলিয়া বা জার্মানিই না। পাশাপাশি সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের বিষয়ে একটি কঠোর অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলো একটি নতুন অভিবাসন ও রাজনৈতিক আশ্রয় চুক্তিতে উপনীত হয়েছে।

ইউরোপীয় কাউন্সিল এবং পার্লামেন্ট বাংলাদেশকে ‘সেফ কান্ট্রি অফ অরিজিন’ বা নিরাপদ উৎস দেশ হিসেবে মনোনীত করেছে। এই সিদ্ধান্তটি ২০২৬ সালের জুন থেকে কার্যকর হবে এবং এর ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে।

সামনে যদি কোনো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন, তবে তা সরাসরি ভিত্তিহীন বলে ধরে নেওয়া হবে এবং তাকে দ্রুততম সময়ে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

বাংলাদেশ ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় ভিসা অফিসাররা এখন আরও কড়াভাবে যাচাই করবেন যে, আবেদনকারী কি সত্যিই পড়ার জন্য আসছেন নাকি কেবল ইউরোপে প্রবেশ করার জন্য স্টুডেন্ট ভিসাকে ‘ব্যাকডোর’ বা চোরাপথ হিসেবে ব্যবহার করছেন।

এই চুক্তির আওতায় কোনো আবেদনকারীর দাবি নাকচ হলে তাকে ইইউ-এর যেকোনো দেশ থেকে সরাসরি বাংলাদেশে ডিপোর্ট বা ফেরত পাঠানো সহজ হবে।

যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। ৫% রিজেকশন সীমার কারণে লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি এবং গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটির মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ থেকে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। তারা আশঙ্কা করছে যে, বাংলাদেশ থেকে উচ্চ রিজেকশন হারের কারণে তাদের নিজেদের স্পন্সরশিপ লাইসেন্স হুমকির মুখে পড়তে পারে।

3

একটা সময় ইতালিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের অনেক ভিড় থাকলেও বর্তমানে সেখানে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। ঢাকাস্থ ইতালি এম্বাসিতে বর্তমানে ৬০ হাজারেরও বেশি আবেদন ঝুলে আছে। বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী স্টুডেন্ট ভিসার পাশাপাশি ওয়ার্ক পারমিট বা ‘নুলা ওস্তা’ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় ইতালি সরকার ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে জারি করা অনেক পারমিট স্থগিত রেখেছে। ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ইতালি সকল লং-টার্ম ডি-ভিসার জন্য ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিতি এবং আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক) প্রদান বাধ্যতামূলক করেছে। এর ফলে আগের মতো এজেন্সির মাধ্যমে গণহারে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়েছে।

ইউরোপের ছোট দেশ মাল্টাও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এখন আর সহজ গন্তব্য নয়। ২০২৪-২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, মাল্টা বর্তমানে ইউরোপের সবচেয়ে কঠোর ভিসা প্রদানকারী দেশগুলোর একটি। মাল্টায় ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৩৮.৫% পর্যন্ত পৌঁছেছে। বাংলাদেশি এবং পাকিস্তানি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে রিজেকশন হার ৬২% এর বেশি।

5

অভিযোগ রয়েছে, অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মাল্টা অথবা স্লোভেনিয়ার মতো দেশগুলোতে শিক্ষার উদ্দেশ্যে গিয়ে সেখানে না থেকে অন্য দেশে চলে গেছে। যার ফলে ওই দেশগুলোও এখন বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থী নেয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে অনেক শর্ত আরোপ করেছে।

সূত্রমতে, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানসহ ইউরোপের দেশগুলো প্রতারক চক্র ধরতে শনাক্তকরণ প্রযুক্তিতেও বড় পরিবর্তন আনছে। নতুন পদ্ধতি হিসেবে যুক্ত হচ্ছে, ‘সার্চ ফান্ড’সহ নতুন নতুন সব টেকনোলোজি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় জালিয়াতি হয় ব্যাংকিং সেক্টরে। কোনো শিক্ষার্থী যখন নিজের বা তার বাবা-মায়ের অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা দেখাতে পারেন না, তখন তারা অসাধু এজেন্সির দ্বারস্থ হন। এজেন্সিগুলো বড় কোনো আমানতকারীর কাছ থেকে কিছুদিনের জন্য টাকা ভাড়া করে শিক্ষার্থীর অ্যাকাউন্টে দেখায়।

অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ এখন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের গত ৬ মাসের ট্রানজেকশন হিস্ট্রি এবং হঠাৎ বড় ডিপোজিটের উৎস কঠোরভাবে যাচাই করে।

এছাড়া ভুয়া স্পন্সরশিপ দেখানো, পড়াশোনার দীর্ঘ বিরতি ঢাকার জন্য জাল সার্টিফিকেট বা কাজের অভিজ্ঞতার সনদ প্রদানের মতো ঘটনাও ঘটে অহরহ।

শিক্ষাখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার নেওয়া পদক্ষেপটি বাংলাদেশিদের জন্য এক বৈশ্বিক সতর্কবাণী। যখন একটি দেশ কোনো জাতিকে লেভেল ১ থেকে লেভেল ৩-এ নামিয়ে দেয়, তখন অন্য দেশগুলোও সেই জাতির প্রতি তাদের নজরদারি বাড়িয়ে দেয়। উন্নত দেশগুলো মেধাবীদের স্বাগত জানাতে চায়, কিন্তু প্রতারকদের জন্য তাদের দরজা বন্ধ হচ্ছে।

ইউরোপের নিরাপদ দেশের তালিকা, যুক্তরাজ্যের ৫% রিজেকশন লিমিট এবং ইতালির বায়োমেট্রিক পদ্ধতি—এই সবকিছুই প্রমাণ করে যে জালিয়াতির কোনো জায়গা আন্তর্জাতিক শিক্ষাঙ্গণে নেই।

সর্বশেষ - আইন-আদালত