অপেক্ষার পালা শেষ। দিনের হিসাব থেকে এখন নির্বাচনী ঘড়ির কাটা চলছে ঘন্টার হিসাব। কয়েক প্রহর পর রাত পোহালেই শুরু হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মহাযজ্ঞ। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বুধবার সকাল থেকেই দেশজুড়ে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনি সরঞ্জাম পৌঁছানোর কাজ শুরু হয়েছে। ব্যালট পেপার, ব্যালট বক্সসহ প্রয়োজনীয় সব উপকরণ ঢাকার বাইরের কেন্দ্রগুলোতে রাতের মধ্যেই পৌঁছে গেছে এবং বড় শহরগুলোতে বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
ভোটের সময়সূচি ও ব্যালট পদ্ধতি: বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। এবারের নির্বাচনে ভোটারদের জন্য থাকছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা, কারণ তারা একই সাথে দুটি ব্যালট পেপারে ভোট দেবেন। সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য ব্যবহার করা হবে সাদা ব্যালট এবং সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত গণভোটের জন্য থাকবে গোলাপি ব্যালট।
ভোটার ও প্রার্থীর পরিসংখ্যান: এবারের নির্বাচনে মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখের বেশি এবং নারী ভোটার প্রায় ৬ কোটি ২৯ লাখ। হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন। ২৯৯টি আসনে লড়ছেন মোট ১ হাজার ৭৫৫ জন প্রার্থী, যার মধ্যে নিবন্ধিত ৫০টি রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন। উল্লেখ্য যে, একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত করা হয়েছে।

নিরাপত্তায় বাহিনীর বিশাল বহর: সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে রাজধানী থেকে শুরু করে দুর্গম পাহাড় পর্যন্ত নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। ১ লাখ ৩ হাজার সেনাসদস্যের পাশাপাশি নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখের বেশি সদস্য মাঠে রয়েছেন। উপকূলীয় আসনগুলোতে নৌবাহিনী এবং দুর্গম এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি সাধারণ কেন্দ্রে ১৬-১৭ জন এবং ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্রে ১৭-১৮ জন করে নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ডিজিটাল নজরদারি: এবারের নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহার এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভোটকেন্দ্রে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা বিশৃঙ্খলা তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবিলা করতে নির্বাচন কমিশন ‘নির্বাচন সুরক্ষা’ নামক একটি বিশেষ অ্যাপ চালু করেছে। প্রিসাইডিং অফিসাররা এই অ্যাপের মাধ্যমে কোনো বিপদের সংকেত দিলে সাথে সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে মেসেজ ও নোটিফিকেশন চলে যাবে, যা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করবে।

বিচারিক তৎপরতা ও আচরণবিধি: নির্বাচনী অপরাধ দমনে ও তাৎক্ষণিক বিচারে ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬৫৭ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত রয়েছেন। ইতোমধ্যে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে ২৫৯টি মামলা এবং প্রায় ৩৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটরা ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় থাকবেন।
সব মিলিয়ে, সাড়ে ৭ লাখের বেশি ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা এবং বিশাল নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় দেশ এখন গণতন্ত্রের এক নতুন অধ্যায় রচনার অপেক্ষায়। ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়াই এখন নির্বাচন কমিশনের মূল লক্ষ্য।


















