শনিবারের সূর্যোদয় মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নিয়ে এসেছিল বারুদের গন্ধ আর মৃত্যুসংবাদ। কয়েক সপ্তাহের টানটান উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘বড় ধরনের যুদ্ধের অভিযান’ শুরু হয়েছে ইরানের মাটিতে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ এই হামলায় শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুই নয়, আক্রান্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবন ও শিশুদের স্বপ্ন। তবে, মার্কিন-ইসরাইলের হামলার জবাব মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দিচ্ছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি আগ্রাসনের জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকায় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৪টি সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান। সূত্রটি বার্তা সংস্থা- তাসনিম নিউজকে জানিয়েছে, কিছু দেশে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিটি দেশের শুধু একটি ঘাঁটির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
ছবি: সংগৃহীত
ঐ সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ইরানের এই ধারাবাহিক আক্রমণে এখন পর্যন্ত মোট ১৪টি মার্কিন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) শনিবার সকালেই ঘোষণা করেছে, আইআরজিসি নৌবাহিনীর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এমএসটি’ নামক একটি কমব্যাট সাপোর্ট ওয়ারশিপ বা যুদ্ধজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলমান এই আক্রমণ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য নৌ-সম্পদও আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের নাগালে রয়েছে।
ইরানের খতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’ নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকবে। মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি বলেন, আমরা আগেই যেমনটা ঘোষণা করেছিলাম, ইসলামি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নিস্ট শাসকের নির্লজ্জ আগ্রাসনের জবাবে, সবগুলো (ইসরাইল) অধিকৃত অঞ্চল এবং এই অঞ্চলে অপরাধী যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের বিধ্বংসী আঘাতের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
তিনি আরও স্পষ্টভাবে জানান, শত্রুর চূড়ান্ত পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান বিরতিহীনভাবে চলবে। মেজর জেনারেল আবদুল্লাহি যোগ করেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুরো অঞ্চলজুড়ে থাকা সমস্ত মার্কিন ঘাঁটি, সম্পদ এবং স্বার্থকে এখন থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গণ্য করা হবে। পাশাপাশি তিনি সাহসী ও বীর ইরানি জাতিকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রতিশ্রুতি দেন, সশস্ত্র বাহিনী অত্যন্ত দৃঢ়তা ও শক্তির সাথে দেশ, জাতি এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে।
তবে চলমান এই যুদ্ধের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি দেখা গেছে দক্ষিণ ইরানের হরমোজান প্রদেশের মিনাব শহরে। একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ইসরাইল-মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত ৫ জন নিষ্পাপ শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছে। রঙিন জামা আর বই-খাতা নিয়ে স্কুলে আসা এই শিশুদের নিথর দেহ এখন আধুনিক যুদ্ধের নির্মম সাক্ষী। এই ঘটনায় শোকাতুর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, শিশুদের এই রক্তের ঋণ শোধ করা হবে।
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের রাজধানী তেহরানের বাসিন্দাদের শহর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দেশটির নিরাপত্তা পরিষদ। যে শহরটি জীবনের স্পন্দনে মুখর থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই সাইরেনের শব্দ আর অনিশ্চয়তার ছায়া। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে নাগরিকদের দ্রুত অন্য কোনো শহরে চলে যাওয়ার এই বার্তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ ও একাকীত্বের জন্ম দিয়েছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থা বলছে, দেশটির ৩১ প্রদেশের মধ্যে ২০টিরও বেশি প্রদেশ ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে। বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে কেঁপে উঠেছে জনপদ। মানবিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতই বিশাল যে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা দুরুহ হয়ে পড়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
আক্রমণের জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ‘অবিরাম অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরাইলি স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো এখন ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তু। কাতারের আল-উদেইদ এবং কুয়েতের আল-সালেম বিমান ঘাঁটিতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবু ধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একজন নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং দুবাইয়ের পাম আইল্যান্ড এলাকা থেকে আগুনের ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। এমনকি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদও বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছে বলে জানিয়েছে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি।
ছবি: সংগৃহীত
একদিকে যখন ধ্বংসের মহোৎসব চলছে, অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তেহরানের সোজা কথা- শত্রুকে এই কাজের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্য এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে যেখানে শান্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ আর যুদ্ধের দামামা প্রবল। স্কুলগামী শিশু থেকে শুরু করে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘর ছাড়া সাধারণ মানুষ, সবাই আজ রাজনীতির দাবার ঘুঁটি। এই সংঘাত শুধু মানচিত্রের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা মানুষের হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে। বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে, এই আগুনের উৎসব কি তবে বড় কোনো মহাপ্রলয়ের পূর্বাভাস?


















