মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা এখনও কাটেনি। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন গতকাল সোমবারও দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল কিনতে হচ্ছে। তেল সংকটে বিভিন্ন এলাকায় স্পিডবোট চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সংকট ঘিরে পাম্পগুলোতে মারামারিও হচ্ছে। গতকাল সিলেট নগরীর একটি পাম্পের কর্মীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এ হামলার প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত সিলেট বিভাগের সব পাম্পে প্রতীকী ধর্মঘট ডাকা হয়েছে।
তবে সরকার দাবি করছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই; কৃত্রিম সংকট তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামলাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে সরকার। এদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এশিয়ার বাজারে গতকাল ক্রুড অয়েলের দাম পৌঁছেছে ১১৪ ডলারে। যুদ্ধ না থামলে এই দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে– এমন আশঙ্কা বাজার বিশ্লেষকদের। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাম্পে গাড়ির লাইন কমছে না
কয়েক দিন ধরে পেট্রোল পাম্প ঘিরে তেল নিতে অপেক্ষমাণ গাড়ি ও মোটরসাইকেলের যে দীর্ঘ লাইন ছিল, তা গতকালও দেখা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের চালকরা। সাইফুল হক নামে একজন উবার মোটরসাইকেল চালক জানান, দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ২৫০ টাকার তেল কিনতে পেরেছেন।
চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ স্পিডবোট চলাচল বন্ধ
জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ নৌরুটে স্পিডবোট চলাচল অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল সকাল থেকে কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটে কোনো স্পিডবোট চলাচল করেনি। তবে কাঠের বোট (ট্রলার), ফেরি এবং বিআইডব্লিউটিসির জাহাজ এমভি মালঞ্চ চলাচল করছে। এই রুটের প্রায় ৯০ শতাংশ যাত্রী স্পিডবোটে যাতায়াত করেন। হঠাৎ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।
বাড়তি তেল কেনায় মজুতে টান
দেশজুড়ে জ্বালানি তেল নিয়ে কাড়াকাড়ি হলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর তেল বিক্রি বেড়েছে। গত বছর মার্চ থেকে জুন মাসে দিনে গড়ে ১২ হাজার লিটার ডিজেল বিক্রি হয়েছে। চলতি মাসের ১ থেকে ৭ তারিখ দিনে গড়ে ১৭ হাজার ৮৯৯ লিটার ডিজেল বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ মার্চ মাসের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬ টন ডিজেল বেশি বিক্রি হয়েছে। এছাড়া অকটেন দিনে ৩৭৭ টন, পেট্রোল ৩৫২ টন বেশি বিক্রি হয়েছে।
বিপিসির গত রোববারের তথ্য অনুসারে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের ১৩ থেকে ৭১ দিনের চাহিদা পূরণের মতো মজুত রয়েছে। ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টন, যা দিয়ে ১৩ দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব। অকটেন রয়েছে প্রায় ২৩ হাজার টন, যা ২৫ দিন চলবে। পেট্রোলের মজুত রয়েছে প্রায় ১৮ হাজার টন, যা দিয়ে ১৭ দিন সরবরাহ করা সম্ভব।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মজুতে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে
দেশে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মজুত জ্বালানি দিয়ে সর্বোচ্চ আগামী ১০ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন সম্ভব বলে জানিয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ)। গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি ডেভিড এ তথ্য জানান। এ সময় সাবেক সভাপতি ইমরান করিম উপস্থিত ছিলেন। ইমরান করিম বলেন, প্রায় সাত দিন আগে পর্যন্ত বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে মোট ১ লাখ ৩০ হাজার টন জ্বালানি তেল মজুত ছিল। এর মধ্যে দুই থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছেই প্রায় ৫৫ হাজার টন তেল রয়েছে। বাকি তেল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও হয়তো এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত তেল থাকবে।
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ
জ্বালানির বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং অবৈধ মজুত ঠেকাতে সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সেই নির্দেশনার অংশ হিসেবে গতকাল রাজধানীর কয়েকটি পেট্রোল পাম্পে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভিযানে দেখা গেছে, রমনা পেট্রোল পাম্পে নিয়ম অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। রাজারবাগের রহমান ট্রেডার্সে ৪ হাজার ৩০৭ লিটার অকটেন থাকা সত্ত্বেও বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে সতর্ক করে তেল সরবরাহ চালু করতে নির্দেশ দেয়। মুগদার শান্ত সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে যানজটের কারণে কিছু সময় ডিজেল সরবরাহ বন্ধ ছিল। ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে সেখানে আবার সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়। এ ছাড়া রাজধানীর বিনিময় সার্ভিস স্টেশন, করিম অ্যান্ড সন্স, এসকে ফিলিং স্টেশন ও মেঘনা মডেল সার্ভিস স্টেশনে স্বাভাবিকভাবে তেল বিক্রি চলছে বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে দাম
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। কিন্তু ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে এ পথ দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ। জ্বালানি সরবরাহে আরও কয়েক দিন বিঘ্ন ঘটলে দাম আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ট্রেডিং ডটকম অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী পিটার ম্যাকগুইর ধারণা করছেন, তেলের দামের দ্রুত উত্থান ও অস্থিরতা আরও নাটকীয় মোড় নিতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও দেশ যদি তেল ও গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, তাহলে দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাবে। তখন ব্যারেলপ্রতি দাম ১৪০ থেকে ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
জ্বালানি সরবরাহে ব্যবস্থা নেবে জি৭
তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর জি৭ জোটের দেশগুলো জানিয়েছে, তারা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহকে সমর্থন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। কৌশলগত অপরিশোধিত তেলের মজুত ছাড়ার বিষয়ে কোনো চুক্তি ছাড়াই জোটের অর্থমন্ত্রীরা গতকাল আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সঙ্গে একটি বৈঠক শেষ করেছেন। ওই ভার্চুয়াল সভায় মজুত থেকে তেল ছাড়ার বিকল্প নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা করেছেন নেতারা।
সভায় জানানো হয়, আইইএ সদস্য দেশগুলোতে বর্তমানে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি সরকারি জরুরি তেল মজুত রয়েছে। আরও ৬০০ মিলিয়ন ব্যারেল শিল্পক্ষেত্রে মজুত রয়েছে সরকারি বাধ্যবাধকতার অধীনে।
বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে জি৭ বলেছে, এই অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে বিশ্বজুড়ে। তেলের দাম বৃদ্ধির ঘটনা ভোক্তা ও ব্যবসার হুমকি। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমাতে পারে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অভিযান
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গতকাল অভিযান শুরু করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। প্রতিদিন ইফতারের পর রাত ১১টা পর্যন্ত এলাকাভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে। জানা গেছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অভিযানে বিভিন্ন এলাকার দায়িত্বে থাকবেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
বন্দরে এসেছে জাহাজ
যুদ্ধ শুরুর পর চট্টগ্রাম বন্দরে মোট পাঁচটি এলএনজি ও এলপিজির জাহাজ নোঙর করেছে। চট্টগ্রামের পথে রয়েছে আরও চারটি এলএনজিবাহী জাহাজ। তবে হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়ায় বুকিং থাকা দুটি জাহাজের এলএনজি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ‘লিব্রেথা’ নামে একটি জাহাজ এলএনজি লোড করার পরও আসতে পারছে না চট্টগ্রামে। ‘ওয়াদি আল সেইল’ নামে আরেকটি জাহাজ এলএনজি লোড করার জন্য হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে যেতে পারছে না টার্মিনালে। জ্বালানি তেল নিয়ে দুটি জাহাজ গতকাল বন্দরে পৌঁছেছে।


















