এক মাস আগেও ‘শুল্ক যুদ্ধের’ মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিনপন্থি মেরূকরণের চেষ্টা করেছেন। ইরানে হামলার পর জ্বালানি সংকটের চাপে সেই ব্যবস্থা ভিন্ন পরাশক্তিমুখী হওয়ার উপক্রম। যেখানে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান ত্রাতা হিসেবে একাধিক দেশ সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, অনন্তকাল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতার জানান দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে অভিযান দ্রুত শেষ করতে চাওয়ার কথা বলছেন। বিপরীতে ইরান উল্টো হুমকি দিয়ে
বলছে, যুদ্ধ কবে শেষ হবে, সে বিষয় এখন তেহরান নির্ধারণ করবে।
ওয়াশিংটনের সুর নরম হওয়ায় পাশার দান হঠাৎ উল্টে গেছে মনে হলেও এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে গত ১২ দিনে। এ সময়ে ইরান একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বড় কয়েকটি তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলা করেছে, অন্যদিকে বন্ধ করে দিয়েছে জ্বালানি পরিবহনের ধমনি হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি। ২২ মাইল প্রশস্ত এই সরু পথটিই এখন যুদ্ধের মোড় ও বৈশ্বিক মেরূকরণ বদলের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে।
এই প্রক্রিয়া কীভাবে ঘটছে, তা বুঝতে চোখ রাখতে হবে ভৌগোলিক অবস্থানে। যেখানে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো দুটি সরু প্রণালিতে আটকা। এই দুই প্রণালি হলো তাদের তেল রপ্তানির প্রধান পথ। একটি লোহিত-এডেন উপসাগর সংযোগকারী বাব এল-মান্দেব, অন্যটি পারস্য উপসাগরের হরমুজ। প্রক্সি গোষ্ঠী (হুতি) ও নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে দুটি জলপথই প্রায় সমানভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ইরান।
সমুদ্রপথে মোট জ্বালানি চাহিদার ১২ শতাংশ (৮.৮ ব্যারেল) পরিবহন হয় বাব এল-মান্দেব দিয়ে। সৌদি আরব ও ইরাকের অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি দিয়ে ইউরোপের দিকে যায়। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বেশি ছয়টি দেশের ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল (দৈনিক) পরিবহন হয় হরমুজ দিয়ে। যা সমুদ্রপথে বৈশ্বিক লেনদেনের প্রায় ২০ শতাংশ। বেশির ভাগ চালানের গন্তব্য চীন, ভারত,
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। প্রশ্ন হলো, পাশার দান উল্টে যাচ্ছে কীভাবে?
২২ মাইলে নির্ভরশীলতা
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও জ্বালানি রপ্তানি করা কাতার, কুয়েত, আমিরাত, সৌদিসহ ছয়টি দেশের চারটিই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে তারা নিজেদের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটিও করতে দিয়েছে। কিন্তু এটিই যেন খাল কেটে কুমির আনার মতো বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
যখনই ইরান ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়, তখনই আরব দেশগুলোর তেল রপ্তানিতে ভাটা পড়ে। শাসক বদলের চেষ্টার পেছনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বারবার হুমকি হিসেবে উল্লেখ করলেও, তেল সরবরাহের পথ বেশির ভাগ সময়ই আড়ালে থেকেছে। এবারের ধাক্কা দেখিয়ে দিল, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ভূরাজনৈতিক সংকটপূর্ণ পথগুলোর ওপর বৈশ্বিক অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল।
মেরিটাইম ডেটা কোম্পানি লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সতর্কতার পর গত রোববার পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ। গতকাল বুধবারও আইআরজিসির নৌবাহিনীর কর্মকর্তা মোহাম্মদ আকবরজাদেহ বলেছেন, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের হাতে।
তেহরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা এখনও বাব এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়নি। তবে এরই মধ্যে মায়েরস্ক, হাপাগ লয়েড এবং সিএমএ-সিজিএমের মতো শিপিং কোম্পানি এই প্রণালি দিয়ে সুয়েজ খালে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে।
নতুন নতুন ত্রাতা
হরমুজ বন্ধ থাকায় সংকট কাটানোর উপায় হিসেবে শুরুতেই জ্বালানিকেন্দ্রিক ত্রাতা হিসেবে দৃশ্যপটে এসেছে রাশিয়া। ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর গত চার বছর ধরে দেশটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল পশ্চিমা দেশগুলো। উন্নত অর্থনীতির সাতটি দেশ (জি৭) মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞাও দেয়। ইউরোপের বাজার হারানোর ফলে রাশিয়া তার সবচেয়ে লাভজনক ক্রেতাদের হারায়। এতে এশিয়ার বাজারে তেল ও গ্যাসে বড় ধরনের ছাড় দিতে বাধ্য হয় মস্কো।
কিন্তু ইরান যুদ্ধ মস্কোর জন্য যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর খোদ যুক্তরাষ্ট্রও রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। সাগরে ভাসমান রুশ জাহাজ থেকে অপরিশোধিত তেল কিনতে সাময়িকভাবে অনুমতি দিয়েছে ভারতকে। অথচ কয়েক মাস আগেও রাশিয়ার সস্তা তেল কেনায় নয়াদিল্লির ওপর শাস্তিমূলক ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল ওয়াশিংটন।
বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মস্কো ইউরোপের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। অপরদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চীনের তেলবাহী জাহাজ যাতে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে, তা নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করেছে বেইজিং। সম্প্রতি ব্লুমবার্গ তাদের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরে। তেহরানের সঙ্গে এই সুসম্পর্কের সুযোগে চীনও সংকটে পড়া অন্যান্য দেশকে জ্বালানি সহায়তার আশ্বাস দিচ্ছে। এ তালিকায় বাংলাদেশও আছে। একই রকম তৎপরতা দেখাচ্ছে ভারতও। যা জ্বালানি ঘিরে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুদ্ধের মোড়ও বদল?
যুদ্ধের চতুর্থ দিনের মাথায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে। মূলত এর পর থেকেই বাড়তে শুরু করে অপরিশোধিত তেলের দাম। যা ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সংকট তীব্র হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও এখন আকাশপথে অভিযান জোরদারের চেয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
এ সুযোগে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও জোর দিয়ে বলেছে, তেহরান এখন শত্রুপক্ষের সম্পূর্ণ পরাজয়ের কথা ভাবছে। গত মঙ্গলবার সিএনএন তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালিতে নৌ অভিযানের কথা ভাবছে। কিন্তু সেখানেও তাদের বিপর্যয়ের শঙ্কা আছে। আবার পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলেও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পকে বিপাকে পড়তে হবে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসও গতকাল তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, পরিস্থিতি দ্রুতই অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। কারণ, হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা হয়ে উঠছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্য সংঘাতগুলোর চেয়েও বড় প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।


















