আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে ইরানে হস্তক্ষেপের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে তেহরান। রোববার (১১ জানুয়ারি) ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পার্লামেন্টে সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো ধরনের হামলার পাল্টা জবাব দেবে তেহরান।
তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন হামলা হলে ইসরাইল এবং ওই অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গণ্য করে পাল্টা আঘাত করা হবে।
ইরানে চলমান বিক্ষোভের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে- এমন আশঙ্কায় ইসরাইল উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে, এমন খবর প্রকাশ্যে আসার পরপরই তেহরান এমন হুঁশিয়ারি দিলো।
ইরানের বর্তমান বিক্ষোভ আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, এই সময় বাইরে থেকে চাপ দিলে সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রধান উদ্বেগ হলো ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ইরানকে আটকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরাইলৱ ১২ দিনের সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলো। সেই বছরের ১৩ জুন ইসরাইল ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামে ইরানের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। ইসরাইলি বিমান বাহিনী এবং মোসাদ যৌথভাবে ইরানের ভেতরে কয়েক ডজন স্থানে অতর্কিত হামলা চালায়।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা (নাতানজ, ফোরদো, ইসফাহান), ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির কারখানা এবং উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডারদের বাসভবন ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
প্রথম দিনেই ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব বড় ধাক্কা খায়। বিপ্লবী গার্ড- আইআরজিসি’র প্রধান হোসেইন সালামি এবং সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ মোহাম্মদ বাঘেরিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ জেনারেল এই হামলায় নিহত হন। এছাড়া অন্তত ১০ জন পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হন।
দ্রুত পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে ইরান। ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৩’ নামে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৯০০টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং এক হাজারটি ড্রোন দিয়ে ইসরাইলে পাল্টা হামলা চালায়। তাদের লক্ষ্য ছিল তেল আবিব, হাইফা তেলের শোধনাগার এবং বিরশেভা শহর।
ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ হামলা রুখে দিলেও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, যাতে অন্তত ২৮-২৯ জন ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
যুদ্ধের শেষ দিকে, ২২ মার্কিন বাহিনী সরাসরি সংঘাতে যোগ দেয়। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে শক্তিশালী ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা ব্যবহার করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র । এর জবাবে ইরান কাতারে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তবে সেখানে কোনো মার্কিন সেনা নিহতের খবর পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধটি ১২ দিন স্থায়ী হলেও এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ভয়াবহ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ইরানে প্রায় ১,০০০-১,২০০ জন নিহত হয়েছেন (যার মধ্যে সেনাসদস্য ও বেসামরিক নাগরিক উভয়ই রয়েছে)। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়।
সরাসরি হামলায় ইসরাইলে ২৯ জন নিহত এবং প্রায় ৬০০ জন আহত হন। এছাড়া সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ধরা হয়েছে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার। ২৪ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপে এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় উভয় পক্ষ একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
ইসরাইল দাবি করে, তারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কয়েক বছর পিছিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, ইরান এই যুদ্ধকে মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের ‘বিজয়’ হিসেবে প্রচার করে।


















