জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণের আগাম খবরে রাজধানীজুড়ে তৈরি হয়েছে অস্থির পরিস্থিতি। সোমবার রাত থেকেই ঢাকার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে বাড়তে থাকে যানবাহনের চাপ। তবে অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ নোটিশ ঝুলিয়ে রাখায় বিপাকে পড়েছেন চালকেরা। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও জ্বালানি না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ভোর থেকে রাজধানীর তেজগাঁও, বাড্ডা, গুলশান ও রমনা এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। বেশিরভাগ পাম্প বন্ধ থাকলেও দু-একটি খোলা পাম্পে ‘অকটেন ও পেট্রোল শেষ’ জানিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রাহকদের। এতে কর্মজীবী মানুষ ও পরিবহন চালকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম ভোগান্তি।
পাম্প মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে সরবরাহ কম থাকায় তাদের কাছে পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। কিন্তু অপেক্ষমাণ চালকদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের ভাষ্য, তেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনায় অতিরিক্ত লাভের আশায় অনেক পাম্প মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন।
বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারেও। গত এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য এখন প্রায় নিয়মিত। অনেক জায়গায় ‘তেল নেই’ লেখা ব্যানার টানানো হলেও পরবর্তীতে সেখানে মজুত তেল থাকার অভিযোগও উঠে এসেছে।
এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারও সক্রিয় রয়েছে। গত শনিবার সরকারি দল বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম জানান, সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে জনগণকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হবে এবং বাজারে অস্থিরতা ঠেকাতে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হবে।
তিনি আরও বলেন, কোথাও যেন তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া না হয় বা কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দাবি করেছেন, পাম্পে দীর্ঘ লাইন সরবরাহ ঘাটতির প্রমাণ নয়। বরং মানুষের অতিরিক্ত কেনা ও মজুত করার প্রবণতাই এই পরিস্থিতির মূল কারণ।
মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হলেও সরকার আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে জ্বালানির মজুত এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার সময় ডিজেলের মজুত ছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন, যা ৩০ মার্চ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টনে। একই সময়ে ৪১ দিনে প্রায় ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী
অন্যদিকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রতি মাসের মতো এবারও নতুন জ্বালানি মূল্য ঘোষণা করা হবে। তার মতে, বর্তমানে সরকারের কাছে ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল মজুত রয়েছে এবং এপ্রিলে আরও প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি দেশে পৌঁছাবে। ফলে সামনের মাসে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই।
তবে এসব আশ্বাসের পরও বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। দাম বাড়ার আশঙ্কায় অনেকেই অতিরিক্ত জ্বালানি কিনতে ছুটছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
রাজধানীর শাহবাগ এলাকার একটি পরিচিত পেট্রোল পাম্পে সকাল থেকেই দেখা গেছে দীর্ঘ যানজট। নিয়ম অনুযায়ী সকাল সাতটায় পাম্প চালু হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তা বন্ধ ছিল। এতে পাম্পের সামনে শত শত মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
সেখানে দায়িত্বরত এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, সকাল আটটা থেকে জ্বালানি সরবরাহ শুরু হবে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পাম্পের সামনে অপেক্ষমাণ বেসরকারি চাকরিজীবী আফজালুল করীম বলেন, ‘গতকাল থেকেই মোটরসাইকেলের তেল শেষ। ভোরে উঠে কয়েকটি পাম্প ঘুরে কোথাও তেল পাইনি। এখানে এসে দেখি এখনো বন্ধ। অফিসে যেতে পারব কিনা বুঝতে পারছি না।’

