যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাপ্তাহিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে শীর্ষ অবস্থানে রেখেছে।
সোমবার প্রকাশিত সাময়িকীটির সর্বশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, “খ্যাতনামা এক রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রধান দাবিদার।”
দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, এটি হবে গত ১৮ মাস আগে সংঘটিত এক ‘বিপ্লব’-এর পর দেশের প্রথম নির্বাচন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ‘জেনারেশন জেড’-এর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করবে।
তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এই পূর্বাভাস এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিন ও ব্লুমবার্গসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একই ধরনের বিশ্লেষণের পর।
প্রতিবেদনে ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার সময়ের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, বুলেটপ্রুফ বাসে তার যাত্রাকালে উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের কারণে বাসটি কয়েক মাইল ধীরগতিতে চলছিল, যেন অপেক্ষমাণ মানুষ তাকে দেখতে পারেন।
দ্য ইকোনমিস্ট মন্তব্য করে, ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনো ‘যথাযথ’ নির্বাচন হয়নি এবং প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কখনো প্রকৃত অর্থে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিআইপিএসএসের শাফকাত মুনিরকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “আমার জীবনের দুই দশক ধরে আমার ভোটের কোনো মূল্য ছিল না।” তিনি বলেন, বর্তমানে রাজধানীজুড়ে নির্বাচনী ব্যানারে ভরে গেছে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এই নির্বাচন তত্ত্বাবধানই হবে শেষ দায়িত্ব। তবে অধিকাংশ মানুষ একমত যে, এই সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার এমন কিছু সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি কমাবে—এর মধ্যে রয়েছে নতুন উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করার প্রস্তাব।
জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, দলটি সংযত শাসনের আশ্বাস দিলেও শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে তাদের অগ্রগতি উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দলটি এবারের নির্বাচনে একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি এবং সংসদীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতিও রয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, এসব বাস্তবতা তারেক রহমানের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে, কারণ তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে।
সাময়িকীটি স্মরণ করিয়ে দেয়, বিএনপি দীর্ঘদিন পরিচালিত হয়েছে তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এবং তার আগে তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তারেক রহমান নির্বাচিত হলে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের প্রশিক্ষণ, পানির সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের বিক্ষোভে হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন, তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না বলে জানান।
দ্য ইকোনমিস্ট মন্তব্য করে, লন্ডন থেকে ফিরে আসা তারেক রহমানকে অনেক পর্যবেক্ষকের কাছেই আগের চেয়ে ভিন্ন ও পরিণত মনে হচ্ছে।


















