রাজনীতিলন্ডন মিরর স্পেশালসর্বশেষ

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের বেশি ক্ষমতাভোগ, এখন পরিবারের সদস্যরা কে কোন দেশে আছেন?

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। দেশজুড়ে তখন সরকারবিরোধী আন্দোলন চরমে। ঠিক সেই সময় সিঙ্গাপুর যাওয়ার অনুমতি চেয়ে শেখ হাসিনাকে ফোন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির তৎকালীন মেয়র ও তার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে শেখ ফজলে নূর তাপস। পরে সেই ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এর ঠিক দুই দিন পর ৫ আগস্ট দুপুরে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানাও। শুধু তারাই নন, একে একে শেখ পরিবারের প্রায় সব প্রভাবশালী সদস্যই দেশ ছাড়েন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। সরকার পতনের আগেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। এর মধ্যে ভারতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করেছেন বলেও আলোচনা আছে।

শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল সরকার পতনের সময় দিল্লিতেই ছিলেন। আওয়ামী সরকারের পতনের পর গত বছরের জুলাইয়ে সায়মা ওয়াজেদকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠায় ডব্লিউএইচও। তিনি কখনো দিল্লি, কখনো দুবাইয়ে থাকেন বলে জানা গেছে।

শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি আওয়ামী লীগের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন- সিআরআই দেখাশোনা করতেন। সরকার পতনের সময় তিনি থাইল্যান্ডে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তার স্ত্রী ফিনল্যান্ডের নাগরিক।

শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ নাগরিক। তিনি ওই দেশের পার্লামেন্টের সদস্য। টিউলিপ সিদ্দিকের বোন আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তী যুক্তরাজ্যের নাগরিক। তিনি বাংলাদেশে খুব একটা আসতেন না। রাজনীতিতেও তার সম্পৃক্ততা দেখা যায়নি।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দেশেই ছিলেন শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ সেলিম। হাসিনার পতনের পর আত্মগোপনে ছিলেন। সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে চলে যান এবং বর্তমানে কলকাতায় আছেন। শেখ সেলিমের ছেলে শেখ ফজলে নাঈমও কলকাতায়। তার আরেক ছেলে শেখ ফজলে ফাহিম শেখ হাসিনার পতনের আগেই দেশ ছাড়েন।

যুবলীগের চেয়ারম্যান ও শেখ হাসিনার ভাতিজা শেখ ফজলে শামস পরশ সরকার পতনের আগের সপ্তাহে কানাডা থেকে দেশে এসেছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঠেকাতে নানা তৎপরতা চালান। সরকার পতনের দিনও তিনি ঢাকাতেই ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসিনা পালানোর কিছুদিন পর পরশ ভারত হয়ে কানাডা যান। সেখান থেকে আবার ভারতে ফিরেছেন।

সরকার পতনের আগে অবস্থা বেগতিক দেখে আগেই ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই ও প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। তিনি প্রায়ই রাজস্থানে আজমির শরিফ দরগায় যাতায়াত করতেন। তার মেয়ে এক ভারতীয় নাগরিককে বিয়ে করেছেন। তার ছেলে আশিক আবদুল্লাহও বাবার সঙ্গে ভারতে গিয়েছিলেন।

আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর বড় ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র। বাবা-ছেলে মিলে পুরো বরিশালের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে সক্রিয় ছিলেন। পরে তিনি দেশ ছেড়ে ভারত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব আছে।

শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের আবদুল্লাহ সরকার পতনের পর ভারতে চলে যান। দুই প্রভাবশালী চাচাতো ভাই শেখ হেলাল ও শেখ জুয়েল ভারতে পালিয়ে কলকাতার নিউ টাউনে দামি আবাসিক কমপ্লেক্সে বাস করছেন। শেখ হেলালের ছেলে শেখ তন্ময়ও ভারতে।

শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ। তা ভাই নিক্সন চৌধুরী সংসদ সদস্য ছিলেন। দুজনই শেখ হাসিনার পতনের পর আত্মগোপনে যান। পরে জানা যায়, তারা ভারতে অবস্থান করছেন।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনার স্বজনদের অনেকে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে গেছেন। সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়েও কেউ কেউ গেছেন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং বিপুল অর্থের বিনিময়ে তাঁরা দেশ ছাড়তে সক্ষম হন। হাসিনার স্বজনেরা নিরাপদে দেশত্যাগ করলেও দলের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী তা পারেননি। এ নিয়ে দলের সাধারণ নেতা–কর্মীদের ভেতর তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।

হাসিনার পলায়ন ও সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতা, তিন ডজনের মতো সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং ৫০ জনের বেশি সাবেক সংসদ সদস্য গ্রেফতার জন। এর মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ ও দবিরুল ইসলাম জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মারা যান। সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন দিনাজপুরে এবং সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আর সরকার পতনের পর দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী মারা যান।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে কাজী জাফর উল্যাহ, মো. আব্দুর রাজ্জাক, মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, দীপু মনি, আহমদ হোসেন ও আবদুস সোবহান গোলাপ কারাগারে আছেন। এ ছাড়া শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলকও কারাগারে আছেন।

দলের একাধিক সূত্রের দাবি, শেখ পরিবারের অনেক সদস্য রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং সীমান্তপথ ব্যবহার করে দেশ ছাড়তে সক্ষম হন। তবে দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী সেই সুযোগ পাননি। এ কারণেই এখন আওয়ামী লীগের ভেতরে প্রশ্ন উঠছে—যারা এত দিন দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের বড় অংশ কারাগারে। আর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন দেশের বাইরে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার দুটি প্রিয় বিষয় হচ্ছে ক্ষমতা ও গোষ্ঠীপ্রীতি। তিনি ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। ব্যর্থ হওয়ার পর জ্ঞাতি–গোষ্ঠীকে নিরাপদে পালাতে সহায়তা করেছেন। আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসন পারিবারিক শাসনে পরিণত হয়েছিল। এ সময় বংশের সবাই সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করেছেন আর সাধারণ কর্মী–সমর্থকদের কামানের গোলা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ভবিষ্যতেও এর পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

সাম্প্রতিক সংবাদ

থানা থেকে পালালেন এএসআই দেলোয়ার

Newsdesk

জামিনে মুক্তি পেলেন জাসদের ২৪ নেতাকর্মী

Newsdesk

ডিসেম্বরের আগেই ব্লু-প্রিন্ট আওতায় গ্রেফতার…

Newsdesk