স্পেনের অধীন স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশের পর যৌন নিপীড়নের ঘটনা বেড়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে অভিবাসীদের ঢল নামার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৩টি যৌন নিপীড়নের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
এসব ঘটনার শিকার ৯ জন শিশুও। সেউতার প্রধান প্রসিকিউটর সিলভিয়া রোহাস এ তথ্য জানিয়েছেন।
তার হিসাবে, এর অর্থ হলো অভিবাসীরা ব্যাপকভাবে প্রবেশ করার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই একটি করে যৌন নিপীড়নের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সংবাদপত্র এল পাইসকে রোহাস বলেন, অভিবাসী নারী ও মেয়েরা সেউতায় বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
কারণ সেখানে তাদের অবস্থান অনিয়মিত হওয়ায় তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ জানাতে বা আইনি সহায়তা নিতে ভয় পেতে পারেন। গত ৩০ ও ৩১ জুলাই মরক্কো থেকে অন্তত ৭২ হাজার অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করেন। তাদের বেশির ভাগই পরে সেউতা থেকে ফিরে গেলেও প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এখনো সেখানে রয়েছে।
আরো পড়ুন
এই বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রবেশের পর উত্তর আফ্রিকার এই স্প্যানিশ শহরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
অভিবাসীদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের উত্তেজনাও বেড়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সেখানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। সেউতার প্রধান প্রসিকিউটর রোহাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শহরটিতে থাকা প্রায় ৫ হাজার অভিবাসীর মধ্যে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ জন শিশু।
এফে সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যৌন নিপীড়নের ঘটনায় সন্দেহভাজনদের মধ্যে চারজন মরক্কোর নাগরিক, তিনজন স্পেনের নাগরিক এবং একজন বেলজিয়ামের নাগরিক রয়েছেন। রোহাস বলেন, বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশের পর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ কয়েক গুণ বেড়েছে।
তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী ভয় বা সেউতায় তাদের বর্তমান অবস্থার কারণে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেননি। সেউতার বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালেও যৌন নিপীড়নের শিকার কয়েকজনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সুসানা আসকাসো গত মাসে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ১০ বছর বয়সী এক শিশুও ছিল।
আরো পড়ুন
মরক্কোর ২৪ বছর বয়সী এক নারী বিবিসিকে তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সেউতায় পৌঁছাতে তিনি নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন। কিন্তু সেখানে একদল নারী ও পুরুষের সঙ্গে ঘুমানোর সময় তিনি যৌন নিপীড়নের শিকার হন। ওই নারী বলেন, ঘটনার পর তিনি হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। আগে থেকে এমন পরিস্থিতির কথা জানলে তিনি সেউতায় আসতেন না বলেও জানান। স্পেনের এপিডেমিওলজি সোসাইটি বলেছে, সীমান্তে তৈরি হওয়া এই সংকট অভিবাসী নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শনাক্ত করা এবং তা মোকাবেলার কঠিন বিষয়টি সামনে এনেছে।
সংকট মোকাবেলায় স্পেন সরকারও অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করেছে। অর্থমন্ত্রী কার্লোস কুয়েরপো জানান, মন্ত্রিসভা কয়েক মিলিয়ন ইউরোর একটি সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। এই অর্থ জরুরি সেবা দেওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকহীন শিশুদের দেখভালের খরচ মেটাতে ব্যবহার করা হবে। পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডাকেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। এদিকে সেউতার মেয়র হুয়ান হেসুস ভিভাস বুধবার স্পেনের মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য দেশটির নাগরিকদের আহ্বান জানিয়েছেন। সেউতার বার্ষিক ছুটির দিনে এসব বিক্ষোভ হওয়ার কথা। এর মাধ্যমে সেউতার প্রতি সমর্থন জানানো হবে।
অভিবাসী সংকট মোকাবেলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী সানচেজ। কট্টর ডানপন্থী ভক্স পার্টি অভিযোগ করেছে, সানচেজ সেউতার নিয়ন্ত্রণ হারাননি, বরং তিনি শহরটিকে অন্যদের হাতে তুলে দিয়েছেন। সেউতা নিয়োগকর্তা কনফেডারেশনের সভাপতি আরান্তসা কাম্পোস বিবিসিকে বলেন, অভিবাসীরা সেউতা থেকে চলে না গেলে শহরটি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবে না। তিনি অভিযোগ করেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের কাছ থেকে এখনো কোনো পরিষ্কার পরিকল্পনা পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি সেখানে থাকা সবাইকে যাচাই করার কাজ কবে শেষ হবে, সেটিও তারা জানেন না।
সংকটের মধ্যে স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে সেউতা সফর করতে পারেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সানচেজ। সোমবার তিনি বলেন, পরিস্থিতি অনুমতি দিলেই রাজা সেখানে যাবেন। এমন সফর হলে সেউতার ওপর স্পেনের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের বিষয়টি আবারও স্পষ্টভাবে সামনে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। সেউতা ও পাশের স্বায়ত্তশাসিত শহর মেলিলার ওপর দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে মরক্কো। ২০০৭ সালে সর্বশেষ কোনো স্প্যানিশ রাষ্ট্রপ্রধান সেউতা সফর করেছিলেন। সে সময় তৎকালীন রাজা হুয়ান কার্লোস সেখানে গিয়েছিলেন। ওই সফরের পর মাদ্রিদ থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করেছিল মরক্কোর রাজধানী রাবাত। ফলে আবার কোনো রাজকীয় সফর হলে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
স্পেনের রেডিও চ্যানেল কাদেনা সেরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সানচেজ বলেন, রাজা প্রায় ২০ বছর ধরে সেউতায় যাননি। তবে ষষ্ঠ ফেলিপে নিজে মাত্র ১২ বছর ধরে সিংহাসনে রয়েছেন। সানচেজ আরো বলেন, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সেউতায় সরকারি সফর করা একমাত্র প্রধানমন্ত্রী তিনি। সংকট শুরুর সময় ৩১ জুলাই তিনি নিজেই সেউতায় গিয়েছিলেন। তবে স্পেনের কয়েকজন ভাষ্যকার মনে করছেন, সানচেজের এই মন্তব্যে রাজার সমালোচনার ইঙ্গিত ছিল। অবশ্য ওই দিন পরে তিনি রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
অভিবাসীদের এই ঢলের জন্য মরক্কোকে সরাসরি দায়ী করতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন সানচেজ। সোমবার তিনি বলেন, মরক্কোর কর্তৃপক্ষ কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিল—এমন কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদন তার কাছে নেই। এর পরিবর্তে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যের বিষয়টি সামনে আনেন। সানচেজের অভিযোগ, এসব অপতথ্যের সঙ্গে রাশিয়া, ইসরায়েল এবং একটি আন্তর্জাতিক কট্টর ডানপন্থী আন্দোলনের যোগ থাকতে পারে। তার মতে, এই আন্দোলন অভিবাসন ইস্যুকে ব্যবহার করে শুধু স্পেন নয়, পুরো ইউরোপকে বিভক্ত ও মেরুকরণের চেষ্টা করছে। তবে সানচেজ স্পষ্ট করে বলেন, এর অর্থ এই নয় যে অপতথ্যগুলো অবশ্যই কোনো রাষ্ট্রীয় পক্ষ থেকে এসেছে। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, অভিবাসীরা সেউতায় প্রবেশ করার পর পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালানো হয়ে থাকতে পারে।
পরে সরকারের মুখপাত্র এলমা সাইসও এই অভিযোগের কথা জানান। তিনি বলেন, বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ইউরোপকে বিভক্ত ও মেরুকরণের উদ্দেশ্যে ঘটনাটিকে আরো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রমাণ রয়েছে। তবে রাশিয়া ও ইসরায়েল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’আর সানচেজকে ‘নির্লজ্জ মিথ্যাবাদী’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সানচেজের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দাবি করেছেন। আগস্টে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। এসব পোস্টে মরক্কো ও সেউতার মধ্যকার সীমান্ত বেড়াকে সহজে পার হওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখানো হয়।
সেউতার মেয়রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত বেড়া এড়িয়ে সাঁতরে সেউতায় যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ১০০ জন মারা গেছেন। স্পেনের তথ্য যাচাইকারী ওয়েবসাইট মালদিতা জানিয়েছে, ৩০ জুলাই অভিবাসীদের ঢল শুরুর আগেই মরক্কোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করে বিভিন্ন বার্তা ছড়ানো হয়েছিল।
মালদিতার তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের জুন মাসের একটি রায়ের পর এসব বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে বিরোধী পিপলস পার্টি প্রধানমন্ত্রী সানচেজের সমালোচনা করে বলেছে, তিনি মরক্কোকে ‘দায়মুক্তি’ দিচ্ছেন এবং একই সঙ্গে অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন। দলটির মুখপাত্র বোরহা সেম্পের বলেন, মরক্কোর কর্তৃপক্ষের অজান্তে কয়েক হাজার মানুষ একসঙ্গে সেউতার সীমান্তের দিকে যেতে পারে না। তবে মরক্কো বিপুলসংখ্যক মানুষের সেউতায় প্রবেশের ঘটনা পরিকল্পিত ছিল বা এতে দেশটির কর্তৃপক্ষ জড়িত ছিল- এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।