গত শনিবার মধ্যরাতে রাজধানীর কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে অতর্কিত হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। ভাঙচুর করা হয় স্টুডিওর দরজা, সিসিটিভি ও কনটেন্ট তৈরির সরঞ্জাম। মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাচের টুকরা, ভাঙা আসবাব ও ছিন্নভিন্ন তারে স্পষ্ট হামলার চিহ্ন।
শুধু সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও নয়, নিউ গিনি প্রোপার্টিজের আবাসন প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনাতেও ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, হামলার সময় প্রকল্পের শ্রমিকদের থাকার জায়গাতেও ঢুকে মারধর ও লুটপাট করা হয়।
হঠাৎ এই হামলার নেপথ্যে কারা, আর কেনই বা একটি কনটেন্ট স্টুডিওকে লক্ষ্য করে এমন তাণ্ডব- এ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এর পেছনে জমি, প্লট ও রাস্তা ব্যবহারের বিরোধের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে।
নিউ গিনি প্রোপার্টিজের মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া আরজু ও মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের মধ্যে জায়গা, প্লট ও রাস্তা ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ বলছে, প্রাথমিক তদন্তে জমিকে কেন্দ্র করে বা জমির দখল-বেদখল নিয়ে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। এক পক্ষ তাদের জমিতে যেতে পারছিল না। পরে ওই পক্ষ লোকজন নিয়ে সেখানে আসে। দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যেই সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
সোমবার আবাসিক এলাকাটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়ক থেকে আনুমানিক ৩০০ গজ ভেতরে নিউ গিনি প্রোপার্টিজের প্রধান ফটক। বড় লোহার গেটটির বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কোথাও ধাতব অংশ বাঁকা, কোথাও ধারালো অস্ত্রের আঘাতের দাগ স্পষ্ট।
স্থানীয়দের দাবি, ধারালো অস্ত্র দিয়ে গেটে হামলা চালিয়ে সেটি ভেঙে প্রকল্পের ভেতরে প্রবেশ করে হামলাকারীরা। হামলাকারীর সংখ্যা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকলেও স্থানীয়দের কয়েকজন জানান, ৪-৫টি পিকআপে করে লোকজন সেখানে আসে। তাদের ধারণা, হামলায় প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ জন অংশ নেয়।
প্রকল্পের ভেতরে ঢুকতেই গেটসংলগ্ন একটি ১০ তলা ভবন চোখে পড়ে। ভবনটির বিভিন্ন অংশেও ভাঙচুরের চিহ্ন রয়েছে। আবাসিক এলাকার সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে এক চিকিৎসক দম্পতি থাকতেন। হামলাকারীরা তাদের মারধর করে মালামাল লুট করে এবং এলাকা ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে ওই দম্পতি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে।
আরও কিছুটা ভেতরে বিশাল টিনশেডের মধ্যে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। বাইরে থেকেই হামলার ব্যাপকতা বোঝা যায়। স্টুডিওতে প্রবেশের কয়েকটি গেট ভাঙা। কোথাও ধারালো অস্ত্রের কোপের চিহ্ন, আবার কোথাও পড়ে থাকতে দেখা যায় গুলির খোসা।
স্টুডিওর ভেতরে ঢুকলে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। দামি আসবাবপত্র থেকে শুরু করে কনটেন্ট তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম ভেঙে ফেলা হয়েছে। মেঝেতে ছড়িয়ে আছে কাচ ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ভাঙা অংশ। একটি কক্ষের আসবাব ও ড্রয়ার তছনছ করা। কোথাও কেটে ফেলা হয়েছে সিসিটিভির তার।
স্টুডিওর এমন কোনো অংশ নেই, যেখানে হামলার চিহ্ন নেই। হামলার সময় আতঙ্কে স্টুডিওর কর্মীরা ওয়াশরুমে আশ্রয় নেন বলে জানা গেছে। মধ্যরাতের এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও।
আবাসন প্রকল্পের শ্রমিকরা জানান, রাত ১১টার দিকে হামলাকারীদের একটি দল সেখানে প্রবেশ করে। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র ছিল বলে দাবি করেন তারা।
একজন শ্রমিক বলেন, ‘আমরা এখানে কাজ করি, এখানেই থাকি। প্রতিদিনের মতো শনিবার রাতে কাজ শেষ করে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এর মধ্যে ১৫-২০ জনের একটি দল আমাদের এখানে এসে কয়েকজনকে মারধর করে। তাদের হাতে শর্টগান, পিস্তল, রামদা, লাঠি, চাপাতি ছিল। তারা অনেকগুলো গুলিও করে। তখন আমরা ভয়ে লুকিয়ে ছিলাম।’
শ্রমিকদের অভিযোগ, শুধু প্রকল্পের স্থাপনাতেই নয়, তাদের থাকার জায়গাতেও হামলা চালানো হয়। তাদের জমানো টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
আরেক শ্রমিক বলেন, ‘আমরা এখানে ৫০ জনের মতো ছিলাম। প্রত্যেকের কাছে টাকা ছিল। তারা রুমে এসে আমাদের সবাইকে বের করে দেয়। কয়েকজনকে মারধরও করে। পরে আমরা ভয়ে বের হয়ে গেলে ভেতরে আমাদের টাকা-পয়সা যা ছিল সব নিয়ে চলে যায়। রুমে ঢুকে আমাদের ব্যাগগুলো ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় পাই। আমাদের অন্তত ৫০ জন শ্রমিকের জমানো টাকা ও ১৬টি মোবাইল নিয়ে গেছে।’
হামলার সময় প্রকল্পের ম্যানেজার জামাল উদ্দিন অফিসে ছিলেন না। তিনি জানান, ওই সময় সেখানে থাকলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারত।
প্রকল্পের একজন নিরাপত্তাকর্মী বলেন, এখানে মোট ১২টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি নিউ গিনি প্রকল্পের। বাকিগুলো অন্যদের। তিনি বলেন, ‘আমি এশার নামাজের জামাত শেষ করে গিয়ে শুয়েছি। না হলে অফিসে থাকলে তো মেরেই ফেলত, এতক্ষণে আমি লাশ হয়ে যেতাম। আমার ৪০ বছরে যা জমিয়েছি সব শেষ করে দিয়েছে। সামনের মাসে নতুন বাসায় উঠব, তাই কিছু মালামাল কিনে এখানে রেখেছিলাম। সব ধ্বংস করে দিয়েছে।’
স্থানীয় এক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাত সাড়ে ১০টার পর দোকান বন্ধ করার সময় তিনি কয়েকজনকে দলবদ্ধভাবে প্রকল্পের দিকে যেতে দেখেন। তাদের সবার মুখে মাস্ক ছিল।
তিনি আরও বলেন, ‘রাত সাড়ে ১০টার পর দোকান বন্ধ করছিলাম। তখন দেখলাম দুই-তিনজন করে ভাগে ভাগে এদিক দিয়ে প্রকল্পের মধ্যে যাচ্ছে। তাদের প্রত্যেকের মুখে মাস্ক ছিল। ভাব খারাপ দেখে আমি চলে যাই।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবীর ভিওডি বাংলাকে বলেন, মিরপুর ও ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন এলাকায় একসময় জলাশয় ও খাল ছিল। এসব জলাশয় বা খাল বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আবাসন ব্যবসায়ীরা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে লিজ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে লিজ নেওয়া জায়গা ভরাট করে ভবন নির্মাণের ঘটনাও ঘটছে বলে তিনি দাবি করেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার আকতার হোসেন ভিওডি বাংলাকে বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পুলিশ ও ডিবি পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রাথমিক তদন্তে জমি, প্লট ও রাস্তা ব্যবহারের বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, তদন্তের ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আইন তাদের ছাড় দেবে না। আইন তার গতিতেই চলবে।