জীবনযাত্রার চড়া ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো ফ্রান্স। দেশজুড়ে শুরু হওয়া আন্দোলন আকস্মিক সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানে ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছে বিক্ষোভকারীরা।
মুখোশ পরা দুর্বৃত্তরা ভাঙচুর চালিয়ে দোকানের কাচ ও শাটার ভেঙে পণ্যসামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে যায়, অথচ এ সময় দৃশ্যত কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তাদের বাধা দেওয়ার তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি।

প্যারিস থেকে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, কালো হুডি পরা ও মুখ ঢাকা দুর্বৃত্তরা দল বেঁধে বিভিন্ন দোকানের ধাতব শাটার টেনে ভেঙে ভেতরে ঢোকে। তারা চোখের নিমেষে দোকানের তাক থেকে সিগারেট, দামি সানগ্লাস, পোশাক, গয়না, প্রাচীন ঘড়ি ও খাবারসামগ্রী লুট করে নেয়।
এএফপির সাংবাদিকেরা একটি সুপারমার্কেট থেকে কেক, ফলের রস ও মদের বোঝাই ব্যাগ নিয়ে লুটকারীদের নির্বিঘ্নে বেরিয়ে আসতে দেখেছেন। কোথাও আবার রাস্তার মোড়ে সাজানো সানগ্লাসের পুরো স্ট্যান্ডই গায়েব করে দেওয়া হয়। দোকানের ক্যাশ রেজিস্টার মেঝেতে আছড়ে ভেঙে নগদ টাকা খোঁজার চেষ্টা করতে দেখা যায় হামলাকারীদের।

ফ্রান্সের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে এই গণবিক্ষোভ দেশটির রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে নতুন মাত্রায় ঠেলে দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের পর শনিবার দেশজুড়ে লাখ লাখ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন। সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের মিছিলে অন্তত ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে শ্রমিক ইউনিয়ন ‘সিজিটি’-র দাবি, রাজপথে নেমে আসা বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও আতশবাজি নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

শনিবার রাতে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু এই ‘অত্যন্ত তীব্র সহিংসতার’ কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি জানান, ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনায় দেশজুড়ে অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্তত ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। অন্যদিকে প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাজধানীর পুরো একটি সড়ক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।” তবে তিনি নাগরিকদের প্রতিবাদ জানানোর ‘মৌলিক অধিকার’ এবং এই ‘অগ্রহণযোগ্য সহিংসতা’র মধ্যে ফারাক তুলে ধরেন।

প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিখ্যাত ‘প্লেস দ্য লা রিপাবলিক’ চত্বরের চারপাশের সড়কজুড়ে ছড়িয়ে ছিল ভাঙা কাচ ও পোড়া ধ্বংসাবশেষ। সড়কটিতে একগাদা জ্বলন্ত সাইকেল থেকে কালো ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। দিনের শুরুতে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হলেও পরবর্তীতে লুটপাটের সময় ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখা যায়নি।
সহিংসতার মধ্যেও শহরের সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে। আবাসিক ভবন, রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলো হামলার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ায় বাইরে যখন ভাঙচুর চলছিল, তখন অনেকে অ্যাপার্টমেন্টের জানালা বা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তা দেখছিলেন। অনেকে আবার শনিবারের নিয়মিত মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত ছিলেন।

আলমা নামের ৩৮ বছর বয়সী এক শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, প্যারিসে এর আগে কখনো এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি। মানুষের ভেতরে গভীর ক্ষোভ রয়েছে তা বুঝি, তবে সম্পদের এভাবে ক্ষতি করা মেনে নেওয়া যায় না। আবার জুলস নামের ২৯ বছর বয়সী এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, যাঁরা আজ রাস্তায় নেমে এমন তাণ্ডব চালাচ্ছেন, তাঁরা সমাজেরই অংশ, যারা নিজেদের মূল ধারার সাথে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের কারণে আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে।