ওয়ান ইলেভেনের কুশীলব, সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের ডানহাত এবং বিশ্বে গণতন্ত্রের শত্রু হিসেবে স্বীকৃত ‘কিংস পার্টি’ গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এটিএম আমিনকে ঘিরে ফের আলোচনা উঠেছে।
মাইনাস-টু ফর্মুলার অংশ হিসেবে কিংস পার্টি গঠন বা বড় দুই রাজনৈতিক দল—বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থীদের নির্বাচনে জয়লাভ করানোর চেষ্টা চালান তিনি। এছাড়া এ দুই দলকে মাইনাস করতে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি তৎকালীন সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে নিতে প্রচেষ্টা ছিল তার।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঘুরেফিরে এটিএম আমিনের বিষয়টি সামনে আসছে। এটিএম আমিন জঙ্গি উত্থানের নাটক মঞ্চস্থকারীদের অন্যতম বলেও তথ্য বেরিয়ে এসেছে মাসুদ উদ্দীন চৌধুরীর মুখ থেকে।
২০০৭ সালে এটিএম আমিন ছিলেন সিটিআইবির পরিচালকের দায়িত্বে। সে সময় ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা তার ওপরে ব্যাপকভাবে নির্ভর করতেন।
মইন ইউ আহমেদ সেনাপ্রধান থাকাকালে সামরিক গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) অধীন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিটিআইবি) তৎকালীন পরিচালক ছিলেন এই এটিএম আমিন।
এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন ‘কিংস পার্টি’ (রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত দল) গঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটাতে ব্যস্ত, সে সময় মূল উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিলেন তিনি। এর অংশ হিসেবে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি (আইডিপি) গঠনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করাতে বলেছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত এ চেষ্টা হালে খুব একটা পানি পায়নি।
পরে ফখরুদ্দিন ও মইন ইউ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পদোন্নতি পেয়ে এটিএম আমিন আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেন। এটিএম আমিন আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক থাকাকালে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার কয়েক মাস পরই তার অতীত কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা সরকার তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। এর সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যান এক সময়ের প্রভাবশালী এই সেনা কর্মকর্তা।
দেশে এক সময় ধর্মীয় উগ্রতা ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটার পেছনেও তাকেও অনেকাংশে দায়ী মনে করা হয়।
এটিএম আমিন ২০০৭ সালের জুনে বিএনপির দুই সংস্কারবাদী নেতা, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসূফ এবং তার ভাই, সাবেক সংসদ সদস্য চৌধুরী আকমল ইবনে ইউসূফের সঙ্গে এক বৈঠকে বসেন। সেখানে বলা হয়, ‘খালেদা জিয়ার বিশ্বস্তরা বয়কট করলেও সংস্কারবাদীদের নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করতে হবে। সংস্কারবাদী এবং তাদের সমমনাদের নির্বাচনের জয় নিশ্চিত করা হবে।’
পরে বিএনপির এ দুই সংস্কারবাদীর মধ্যে একজন জানান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিনের এক আত্মীয়ের (কাজিন) কাছ থেকে একটি ফোনকল পেয়েছিলেন তিনি। তার কাছে সংস্কারবাদীদের তালিকা ওই ফোনকলে জানতে চাওয়া হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অন্য সংস্কারবাদীরাও একই বিষয়ে ডিজিএফআইয়ের কাছ থেকে ফোনকল পেয়েছিলেন।
সে সময় খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির মামলার আইনজীবী ছিলেন মোহাম্মদ নওশাদ জমির। তারেক রহমানের সমর্থনে কোনো কথা প্রকাশ্যে না বলার জন্য ব্রিগেডিয়ার আমিনের পক্ষ থেকে তলব করা হয়েছিল তাকে।
রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সামরিক সচিব ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আমিনুল করীম। এক-এগারোর সরকারের কিংস পার্টি গঠনের প্রচেষ্টায় মেজর জেনারেল এটিএম আমিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে সে সময় জানা যায়।
তার ভাষ্যমতে, ‘তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ মেজর জেনারেল আমিনের ওপর নির্ভর করতেন। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার সঙ্গে মইন ইউ আহমেদের যোগাযোগই হতো এটিএম আমিনের মাধ্যমে। শোনা যায়, সে সময় কিংস পার্টি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আমিন। কোরেশী এবং ইব্রাহিম সাহেবকে দিয়ে কিংস পার্টি গঠনের কথা সেনাবাহিনী থাকাকালীন সময়েই শুনেছিলাম। সে সময় ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টির (আইডিপি) কথা না শুনলেও পরবর্তী সময়ে এ দলটি গঠনের প্রচেষ্টায় এটিএম আমিনের কথা শুনেছিলাম।’
তার এই বক্তব্য একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
মেজর জেনারেল এটিএম আমিনের ওপর মইন ইউ আহমেদের নির্ভরশীলতার কারণ ছিল—‘আমিন ছিল ভীষণ মেধাবী ও সাহসী। যেকোনো কাজ দিলে খুব দ্রুতই তা করে দিত। তার এসব গুণ দিয়ে এক সময় মইন ইউ আহমেদের খুব কাছের মানুষ হয়ে যান।’
কূটনীতিকদের একটি সূত্র জানিয়েছে, হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) একাংশকে দিয়ে আইডিপি গঠনে মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিনের প্রচেষ্টা সে সময় কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রেও চলে গিয়েছিল। ২০০৮ সালের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কয়েক সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক চলাকালীন জেমস মরিয়ার্টি জানান, এর আগে ৩০ অক্টোবর ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড বাউচারের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার একটি বৈঠক হয়। সেখানে শেখ হাসিনা হুজি-বি সংশ্লিষ্টদের দিয়ে আইডিপি গঠনের প্রসঙ্গটি তোলেন।
এটিএম আমিন তার সঙ্গে যোগাযোগ করে রাজনৈতিক দল হিসেবে আইডিপির নিবন্ধনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা জানান। যদিও শেখ হাসিনা সেখানে আরও দাবি করেন, তাকে ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যাচেষ্টার কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে আইডিপি সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা ছিল। এ কারণে নির্বাচন কমিশন বা মার্কিন সরকারের কাছে আইডিপির বিষয়টি নিয়ে কথা বলার বিষয়ে তিনি অস্বস্তি বোধ করেন।
একই সঙ্গে শেখ হাসিনা তাকে আটকে রাখা অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে দরকষাকষির জন্য ব্ল্যাকমেইল করার জন্য এটিএম আমিনের বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করেন। হাসিনা সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি নিয়ে এটিএম আমিন হয়তো নিজ উদ্যোগেই দৌড়ঝাঁপ করছেন এবং হয়তো তা নিজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগোচরেই করছেন।
আইডিপি গঠন নিয়ে এটিএম আমিনের সঙ্গে এক আলোচনায় হুজি-বির সদস্যদের নিয়ে আইডিপি গঠনের বিষয়টিতে অনুযোগ প্রকাশ করেছিলেন জেমস মরিয়ার্টি। শুরুতে এটিএম আমিন হুজি-বির সাবেক সদস্যদের রাজনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসার পক্ষে কিছুক্ষণ বক্তব্য রাখেন। পরে বিষয়টি নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিজ দেশের সরকারের উদ্বেগ প্রকাশ করলে এটিএম আমিন বলেন, তাদের ওপর সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কড়া নজর রয়েছে। আবার একই সঙ্গে বিষয়টিতে সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্বীকার করেন তিনি।
এর আগে ২০০৭ সালের ১৯ জুলাই এক মার্কিন কূটনীতিককে আমিন বলেছিলেন, হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশকে (হুজি-বি) তাদেরই অনুপ্রবেশ করান। একই সঙ্গে হুজিবি মার্কিন স্বার্থের ওপর আঘাত হানবে না বলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করেন।
শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস পর মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন ২০০৯ সালের ১৭ মে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। তখনই দুবাইয়ে চলে যান বলে শোনা যায়। তার অবস্থান বা বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কেউ স্পষ্ট করে বলতে না পারলেও এখনো মধ্যপ্রাচ্যে আছেন বলে একটি সূত্র থেকে তথ্য পাওয়া গেছে।