জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করে তেহরানের অবস্থান তুলে ধরেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইরান সন্ত্রাসবাদের জন্মদাতা নয় বরং নিজেই এর শিকার। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নিজেদের প্রতিরক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পেজেশকিয়ান বলেন, ট্রাম্প গতকাল আমাদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই, আমরা সন্ত্রাসী নই; আমরা বারবার নির্মম সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছি। বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি ইরানের ওপর হওয়া হামলা এবং হামলায় নিহত সুপ্রিম লিডারের ছবি জনসমক্ষে তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, কোনো আইনি কাঠামো বা সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি স্কুলেও বোমা বর্ষণ করা হয়েছে। পেজেশকিয়ান বলেন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহার করে ইরানের অবকাঠামো ও শহরের ওপর হামলা চালানো হলেও ইরানি জনগণ মাথা নত করেনি।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে ইরানি প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট সতর্কতা দেন। তিনি জানান, তেহরান কখনোই হরমুজ প্রণালিকে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানোর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দেবে না। এক পক্ষ মুক্তভাবে সুবিধা নেবে আর সেই জলপথ ব্যবহার করেই ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতা তৈরি করবে; এমন সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না বলে তিনি সতর্ক করে দেন।
ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ইরান কোনো দিন আগে থেকে কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি কিংবা অন্য কোনো দেশের ওপর আগ্রাসন চালায়নি। সবসময় আলোচনার টেবিলেই সম্মানজনক সমাধানের চেষ্টা করেছে তেহরান। তবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তারা পিছপা হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বোঝা উচিত, নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ কিংবা বুুলিং বাড়িয়ে ইরানিদের দমিয়ে রাখা যাবে না। ইরানের মানুষ কখনোই নতজানু হবে না বা মাথা নোয়াবে না।
ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করেন পেজেশকিয়ান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইসরায়েল অব্যাহতভাবে হত্যাযজ্ঞ ও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, আর শাস্তি হিসেবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে ইরানকে। একে বিশ্ব নেতৃত্বের চরম নীতিহীনতা ও দ্বিমুখী আচরণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর গণহত্যার চিত্র তুলে ধরে বলেন, আন্তর্জাতিক বিশ্বের চরম ব্যর্থতার জলন্ত উদাহরণ আজকের গাজা। ফিলিস্তিনে দখলদারিত্ব, অবিচার ও নিপীড়ন অব্যাহত রেখে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও অধিবেশনমঞ্চে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি জানান, দেশটির আত্মরক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যেন বাইরের কোনো শক্তি শহরের ওপর হামলার সাহস না দেখায়। পরমাণু প্রযুক্তি গুটিকয়েক দেশের একচেটিয়া অধিকারে থাকা মেনে নেওয়া যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইরানের পরমাণু প্রযুক্তির প্রয়োজন রয়েছে, তবে কোনো পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির জন্য আঞ্চলিক প্রতিরোধ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।