নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে বিধ্বংসী বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও সাড়ে চার হাজারেরও বেশি মানুষ। বিশেষ করে ত্রিসূলী নদীর তীরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাদাভরা টানেলে আটকে পড়া শত শত শ্রমিকের উদ্ধারকাজ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
নেপাল ট্র্যাজেডির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক চিত্র দেখা যাচ্ছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে। প্রায় ৯০০ জন শ্রমিক সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে আনুমানিক ৬০০ জন মাটির তলদেশের বিশাল টানেলে আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী ও উদ্ধারকারীরা টানেলে অক্সিজেন ও বাতাস সরবরাহ করছেন।

তবে ভেতরে প্রবেশ করে এখনও কাউকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, যা স্বজনদের মধ্যে হতাশা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভূগর্ভস্থ টানেলে বাতাসের ব্যবস্থা থাকায় অনেকে অলৌকিক কিছুর আশা করছেন, আবার সময় গড়াচ্ছে বলে আশাও ফিকে হয়ে আসছে।
হিমালয়ের এই বিষম প্রাকৃতিক দুর্যোগে নেপালের অন্তত ১১টি নির্মাণাধীন ও সমাপ্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকাজ দ্রুত করতে নেপাল ও চীন সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি ভারত, কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা একযোগে কাজ করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধসের ফলে বড় আকারের পাথর ও কাদা জমে পুরো এলাকা একটি ‘চাঁদের পৃষ্ঠের’ মতো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, যার ফলে টানেলগুলোর সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা বর্ণনা করে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ একে ‘অসাধারণ ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই হিমালয় অঞ্চলে এমন ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বলে জানিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার তাগিদ দেন।

এদিকে নদীর নিম্নাঞ্চলের দৃশ্যও বেশ শোচনীয়। চিতওয়ানে নদীর তীরে ভেসে আসা প্রায় ৩০০টি লাশের অস্থায়ী গণকবরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হিমায়িত ব্যবস্থা বা ফ্রিজার না থাকায় পচন ধরা লাশগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে আপাতত মাটি দেওয়া হচ্ছে, যাতে পরবর্তীতে স্বজনরা পরিচয় নিশ্চিত করে দেহাবশেষ বুঝে নিতে পারেন। ইতোমধ্যে উদ্ধার হওয়া লাশগুলোর অধিকাংশেরই পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
সীমান্তের অপর পার চীনের তিব্বত অংশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গ্যিরোং বন্দর এলাকার একটি পানির টাওয়ার ছাড়া আর কোনো কাঠামোর অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই। চীনা কর্তৃপক্ষের মতে, সেখানে নিহতের সংখ্যা ১৬ এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

তিব্বতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পাঞ্চেন লামা নিহতদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেছেন। তবে প্রকৃত ক্ষতির মাত্রা লুকোতে চীন এবং নেপাল উভয় দেশেই অনলাইনে তথাকথিত গুজব বা সঠিক তথ্য প্রচার নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক দলগুলো বর্তমানে হেলিকপ্টার ও ড্রিলিং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। স্বজনরা এখনও পথ চেয়ে আছেন, যদি অলৌকিকভাবে মাটির নিচ থেকে কিংবা কাদার স্তূপ থেকে ফিরে আসে তাদের প্রিয়জন।
তথ্যসূত্র: বিবিসি-সিএনএন