বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বাজেট অনুমোদন, বিকেলে সংসদে পেশ

মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।

বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ মন্ত্রিপরিষদের অন্য সদস্যরা অংশ নেন। নিয়মানুযায়ী, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বাজেট প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে সই করবেন। এরপর বিকেল তিনটায় জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট উপস্থাপন। এক জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে নতুন এই অর্থবছর।

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরাতে সরকারকে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যার প্রথম ধাপ এই বাজেট। তবে বিশাল অঙ্কের এই বাজেটের লক্ষ্য ও উপাত্তের চেয়ে তা কতোটা সময়োপযোগী এবং বাস্তবায়নযোগ্য, সেদিকেই নজর ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের। অন্যদিকে কর ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের নিশ্চয়তা চান দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা।

মোট ব্যয় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি, ঘাটতি ২.৪৩ লাখ কোটি

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাজেট বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মোট আকার হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল পূর্ববর্তী ঋণের সুদের ব্যয় মেটাতেই বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এক লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

বিশাল এই ব্যয়ের বিপরীতে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ধার করা হবে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা (যার সিংহভাগই আসবে ব্যাংকিং খাত থেকে) এবং বিদেশি উৎস থেকে ঋণ হিসেবে আসবে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।

আয়ের বড়ো ভরসা এনবিআর, সিংহভাগই যাবে পরিচালন ব্যয়ে

অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাজেটের মোট আয়ের ৬৪ শতাংশেরই জোগান দিতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)। এবার এনবিআরের ওপর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। আর ঘাটতি অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস বা ব্যাংক থেকে সাড়ে ১৩ শতাংশ এবং বিদেশি ঋণ থেকে প্রায় ১২ শতাংশ নির্ভরতা থাকছে।

কিন্তু চিন্তার বড়ো কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিচালন ব্যয়। তথ্য বলছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্য পরিচালন ব্যয় বাবদই চলে যাবে মোট বাজেটের ৬৭ শতাংশ অর্থ। বিপরীতে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ থাকছে ৩২ শতাংশের কিছু বেশি, টাকার অঙ্কে যা তিন লাখ কোটি টাকা। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা ও উন্নয়ন বরাদ্দের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সরকারকে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

শিক্ষায় রেকর্ড, গুরুত্ব পাচ্ছে সামাজিক খাত ও জুলাই শহীদ পরিবার

নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রথম এই বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। খাতভিত্তিক বরাদ্দের মধ্যে শিক্ষাখাতে রেকর্ড এক লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।

সামাজিক অবকাঠামো খাতে সরকার দুই লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। এর মধ্যে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাবদ সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা এবং দেশের সাড়ে ৪২ লাখ কৃষকের ‘কৃষি কার্ডে’র জন্য এক হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের জন্য প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং আহতদের জন্য শ্রেণিভেদে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া দেশের মসজিদসমূহের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও মন্দিরের পুরোহিতদের কল্যাণার্থে এক হাজার ৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যোগাযোগ খাতে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে ৪ি১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের চোখে ‘গরিবের বাজেট’ প্রত্যাশা

লাখ কোটি টাকার এই বিশাল হিসাব-নিকাশ নিয়ে দেশের বড়ো সাধারণ জনগোষ্ঠীর কোনো উচ্ছ্বাস নেই। চাল-ডাল, মাছ-মাংস ও কাঁচা শাকসবজির দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমূল্যের আগুনে নাকাল সাধারণ মানুষ প্রতিদিনের আয়-ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। আবাসন বা ঘরভাড়ার উচ্চ ব্যয়, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা সীমিত আয়ের মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা—নিত্যপণ্যের দাম যেন কমে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, সরকার যখন অর্থায়নের জন্য ধার-কর্জের ওপর নির্ভর করছে, তখন খরচও বাড়ছে। তবে নানামুখী টানাপোড়েনের মাঝেও সরকার যদি কিছুটা কৌশলী ও বাস্তবমুখী হয়, তবে সীমিত আয়ের মানুষকে স্বস্তি দিয়ে একটি কল্যাণমুখী বাজেট প্রণয়ন ও নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব নয়।

সাম্প্রতিক সংবাদ

দেশের সব মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করতেই এবারের বাজেট: অর্থমন্ত্রী

Newsdesk

ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার

Newsdesk

‘ই-হেলথ কার্ড’ পাচ্ছে পাঁচ জেলার মানুষ, জানালেন প্রধানমন্ত্রী

Newsdesk