মহালয়ার দিন ‘কন্যারূপে’ ধরণীতে পা রেখেছিলেন দশভূজা দেবী দুর্গা; বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এক বছরের জন্য তাকে বিদায় জানানো হচ্ছে। ‘আসছে বছর আবার হবে’—আশার এ চিরন্তন সুরকে বুকে ধারণ করেই সিঁদুরের লাল রঙে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাচ্ছেন ভক্তরা।
বয়স বা পরিচয়ের দেয়াল ডিঙিয়ে বিজয়ার এই সিঁদুরে একাকার হয়ে যান উপস্থিত সবাই। ঢাকের তালের সঙ্গে তরুণ-তরুণী ও পরিবারের সব সদস্যের নাচ-গান, ছোটদের বড়দের পদধূলি গ্রহণ এবং কোলাকুলিতে এক নতুন মাত্রা পায় বিজয়ার উৎসব।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালী মন্দির ও গুলশান-বনানীর পূজামণ্ডপগুলোতে বিজয়ার এ রক্তিম আবহ ফুটে ওঠে। দেবীকে মিষ্টিমুখ করানো ও সিঁদুর ছোঁয়ানোর পর সধবা নারীদের কোলাকুলি ও কুশল বিনিময়ে এক অপূর্ব দৃশ্য রচিত হয়। সময়ের পরিক্রমায় সিঁদুর খেলার আয়োজনে এসেছে আধুনিকতার পরশ। ঐতিহ্যগতভাবে কেবল বিবাহিত নারীদের প্রথা হলেও বর্তমানে এটি রূপ নিয়েছে সার্বজনীন এক মিলনমেলায়।
বরণ পর্ব শেষ হতেই শুরু হয় একে অপরের গালে ও কপালে সিঁদুর মাখানোর মূল আনন্দ উৎসব। এ সময় নাচে-গানে ‘আনন্দময়ীর’ বন্দনা করার পাশাপাশি দেবী দুর্গার জয়ধ্বনি তোলেন ভক্তরা। রক্তিম এ আবীরে কেবল ধর্মীয় আচারই প্রকাশ পায় না, বরং তা ধারণ করে আমাদের সংস্কৃতির পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও গভীর সামাজিক বন্ধন। বিশ্বাস করা হয়, মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে পতিগৃহে ফিরে যাওয়ার মুহূর্তে দেবী দুর্গা ভক্তদের জন্য চিরন্তন শুভ্রতা ও মঙ্গলের আশীর্বাদ রেখে যান।
সিঁদুর খেলা শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম পরিচিত ও আবেগময় রীতি। প্রথা অনুযায়ী, বরণডালায় সিঁদুর, পান, প্রদীপ ও মিষ্টি সাজিয়ে দেবী দুর্গাকে বরণ করেন নারীরা। দেবীর কপাল ও চরণে সিঁদুর ছোঁয়ানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ আনুষ্ঠানিকতা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দেবীর চরণে সিঁদুর নিবেদনের মাধ্যমে স্বামীর পরমায়ু বৃদ্ধি পায় এবং পরিবারে নেমে আসে সর্বাঙ্গীন কল্যাণ।
বিদায়ের সেই বিষাদের সুরকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েই পূজামণ্ডপগুলোতে জমে ওঠে সিঁদুর খেলা। লাল-পেড়ে সাদা শাড়িতে সজ্জিত নারীরা দেবীকে সিঁদুর পরিয়ে দেয়ার পর একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে ভাগ করে নেন বিজয়ার আনন্দ। বিদায়ের বিষণ্নতার সঙ্গেই মিলেমিশে থাকে উৎসবের আমেজ, প্রিয়জনের মঙ্গলকামনা আর আগামী বছর আবারও একসঙ্গে মেতে ওঠার প্রত্যাশা।