ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ যখন এক চরম অনিশ্চয়তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, ঠিক তখনই মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক বিস্ফোরক পরিকল্পনা সামনে এসেছে। পারমাণিক বোমার বাইরে দেশটির হাতে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ভয়ঙ্কর বোমা দিয়ে ইরানে হামলার ছক কষা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি পুনরায় সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দেন, তবে ইরানের পারমাণু কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিতে মার্কিন সামরিক বহরে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করে এক নতুন আঘাত হানার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। এটিকে বলা হয় ‘মাদার অব অল বোম্বস’।
আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে এই যুদ্ধের তীব্র অপ্রিয়তা এবং দুপক্ষের মধ্যে কোনো স্থায়ী কূটনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন চরম রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে একটি ‘প্রতীকী জয়’ উপহার দিতে এবং যুদ্ধ থেকে সম্মানজনক উপায়ে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করতেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন এই সর্বাত্মক ও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক বিকল্পটি টেবিল প্রস্তুত রেখেছে।

‘মাদার অব অল বোম্বস’ ঠিক কী ধরনের বোমা?
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ভাণ্ডারে থাকা পারমাণবিক ক্ষমতা ছাড়া সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী বোমার নাম ‘জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট’, সংক্ষেপে ‘এমওবিএ’। যা সামরিক মহলে ‘মাদার অব অল বোম্বস’ নামে বহুল পরিচিত। বলা হচ্ছে, এগুলো সবচেয়ে বেশি ওজনের বিস্ফোরক ভর্তি বোমা।
ওজন: ২১,৬০০ পাউন্ড (প্রায় ৯,৭৯৭ কেজি)।
কার্যপ্রণালী: এটি ভূমিতে আঘাত করার ঠিক আগেই বাতাসে বিস্ফোরিত হয় এবং চারপাশের ৯টি সিটি ব্লকের সমান বিশাল এলাকা এক লহমায় তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
ইতিহাস: ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষকে মানসিকভাবে আতঙ্কিত ও আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র’ হিসেবে এটি তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানে আইএস-এর ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ধ্বংস করতে প্রথমবারের মতো বাস্তবে এই বোমাটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

ইরান হামলায় কতটা কার্যকর হবে এই মহা-বোমা?
সামরিক বিশেষজ্ঞ ও পেন্টাগনের ভেতরের সূত্রগুলো অবশ্য এই বোমার মূল কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো, বিশেষ করে বিতর্কিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর মতো কেন্দ্রগুলো সুউচ্চ পর্বত ও শক্ত গ্রানাইট পাথরের বহু গভীরে নির্মিত।
জিবিইউ-৪৩/বি একটি বিশাল বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম হলেও, মাটির এত গভীরে গ্রানাইট কেটে ভেতরে প্রবেশ করার মতো ক্ষমতা এটির নেই। ফলে এই বোমা ব্যবহারে ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। অধিকন্তু, এটি ঘনবসতিপূর্ণ বা সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ির কাছে থাকা জ্বালানি ক্ষেত্রে ফেলা হলে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির চরম ঝুঁকি তৈরি হবে।
তা সত্ত্বেও পেন্টাগনের একটি অংশ মনে করছে, যদি ট্রাম্প স্থলসেনা না পাঠিয়ে এবং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পুনরায় শুরু না করে কোনো বড় ধরনের ‘চোখধাঁধানো সামরিক মহড়া’ বা মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতে চান, তবে এমওএবি হতে পারে তাঁর অন্যতম অস্ত্র।

মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমীকরণ
মার্কিন প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকম) এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঠিক আগেই যুক্তরাষ্ট্র এই চূড়ান্ত হামলা চালিয়ে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করার চিন্তা করছে। তবে ট্রাম্প প্রকাশ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন কোনো হামলার কথা অস্বীকার করলেও, তাঁর পরামর্শকদের অনেকেই বলছেন ট্রাম্পের অবস্থান যেকোনো মুহূর্তে বদলাতে পারে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা বেশ কিছু দিন ধরেই ইরানকে একটি চরম সংকেত দেওয়ার পথ খুঁজছেন, যার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার চুক্তি নিশ্চিত করা।
পেন্টাগনের প্রতিনিধি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী মার্কিন সামরিক বাহিনী সব ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্যই রণকৌশল প্রস্তুত রাখে। আর হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও জানান, ইরান যাতে কোনোদিন পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে, সে জন্য ট্রাম্প সব পথই খোলা রাখছেন।
সব মিলিয়ে, ইরানের ওপর ‘মাদার অব অল বোম্বস’ ব্যবহারের এই সামরিক পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে আরও এক চরম ও বিপজ্জনক ট্র্যাকে ঠেলে দিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা।