বাংলাদেশসর্বশেষ

মূল্যস্ফীতির শঙ্কায় তিন ধাপে সরকারি কর্মচারীদের বেতন

মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন বেতন স্কেলের মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর করা হবে। তবে সব ধরনের ভাতা একযোগে মিলবে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে। চলতি সপ্তাহেই এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে তথ্য অধিদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে বেতন বৃদ্ধির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ।

সরকারের হিসাবে, প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন। এটি বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। তবে দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেতন বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপ সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন বেতন স্কেল ঘোষণা হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা– সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আগের পরিস্থিতিতে চলা কঠিন হয়ে পড়েছিল। জীবনযাত্রার মানও অনেক কমে গিয়েছিল। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দুদিকের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে তিন ধাপে বাস্তবায়ন
একযোগে পুরো বেতন না দিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পেছনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিই প্রধান বিবেচনা ছিল বলে জানান নাসিমুল গনি। তাঁর ভাষায়, অবশ্যই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি খেয়াল রাখা হয়েছে। না হলে তো একযোগেই পুরো টাকা দিয়ে দেওয়া হতো।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এরপর ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে সব ভাতা একযোগে কার্যকর হবে। কম আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিতে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়বে বলেও মনে করছে সরকার।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মানুষের হাতে টাকা না থাকলে অর্থনীতি সচল থাকে না। কৃষকের হাতে সরাসরি টাকা দেওয়া, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা কিংবা শিল্পীদের আর্থিক সহযোগিতার লক্ষ্যও বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়ানো। তিনি বলেন, মানুষের হাতে অর্থ গেলে তারা কেনাকাটা করবে এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। নতুন পে স্কেলের ক্ষেত্রেও একই চিন্তা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যারা আগে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, বেতন বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে।

১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে অগ্রাধিকার
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে কম আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আগে সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি হিসাবে, নতুন কাঠামোয় নিম্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি। ২০তম গ্রেডে বর্তমান মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডে নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার থেকে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি, নিচের দিকের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বেতন কাঠামোতেও তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

পেনশনেও বড় বৃদ্ধি
অবসরপ্রাপ্তদের জন্যও সুখবর রয়েছে নতুন কাঠামোয়। সরকার আপাতত ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন পদ্ধতি চালু না করলেও ২০৩০ সালের মধ্যে তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর আগে ধাপভিত্তিক নিট পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হবে। মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়বে। ৯ হাজার এক টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার এক থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার এক থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার এক টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ বাড়বে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য নতুন সুবিধা
নতুন বেতন কাঠামোয় প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে তিন হাজার টাকা ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এতদিন পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত থাকা মোবাইল ভাতার আওতা বাড়িয়ে সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীকে এ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডে অপেক্ষা
টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ বিষয়ে এসআরও জারি না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। নিয়ম বা পরিবর্তনগুলো প্রজ্ঞাপন জারির পরই স্পষ্ট হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত অর্থ কোথা থেকে আসবে, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, তিন বছরের হিসাব ধরে এই অর্থের সংস্থান বিবেচনা করা হয়েছে। বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে পর্যায়ক্রমে অর্থের প্রয়োজন হবে। ফলে আগামী দুই বছরেই পুরো অর্থের প্রয়োজন পড়বে না।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে রাখা হয়েছে।

জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো ঠিক করতে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে। তবে তারা ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতন পাবেন, যা ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো সম্ভব হবে।

ওয়েজ বোর্ডেও ‘গতি’ আসার আশা
সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পর ওয়েজ বোর্ডের বিষয়টিতেও গতি আসবে। এটি আর আগের মতো পড়ে থাকবে না।
তবে প্রায় পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী নতুন বেতন স্কেলের সুবিধা পাবেন কিনা, সে বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত যথাসময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। কমিশন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে গত ২১ জানুয়ারি। বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি দীর্ঘ চার মাসে আটটি সভায় পর্যালোচনা শেষে গত ১২ আগস্ট চূড়ান্ত সুপারিশ প্রতিবেদন তৈরি করে। এর মধ্যে গত ৬ আগস্ট জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন ২০২৫-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও সুপারিশ প্রণয়নে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি গঠন করে সরকার। এরপর গতকাল সচিব কমিটির সুপারিশের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

সাম্প্রতিক সংবাদ

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর বিদেশি নাগরিকত্ব যাচাইয়ে আইনি নোটিশ

Newsdesk

মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

Newsdesk

নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যায় নিহত হাজার পার

Newsdesk