রাজপথে তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। দলটি স্তরে স্তরে সংকটে পড়ে ভবিষ্যৎ কৌশল পুনর্বিবেচনায় বাধ্য হচ্ছে। একইসঙ্গে দলের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন।
এএফপি ও রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, ভারতের রাজনীতিতে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বিজেপি ও মোদির একচ্ছত্র আধিপত্য এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এখন ভাঙনের পথে।
তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বিজেপির ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তিকে গভীর প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। তাদের আন্দোলন আরও বেশি রাজনৈতিক রূপ নিয়ে ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।
বেকারত্ব, শিক্ষার অনিয়ম, দুর্নীতি ও নির্বাচনি স্বচ্ছতার মতো বিষয় ঘিরে প্রশ্ন ও বিরোধ এখন মোদি সরকারের বিরুদ্ধেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। জেন-জেড আন্দোলনের এই অভূতপূর্ব ঝড়ে মোদির রাজনৈতিক কৌশল কার্যত চাপে পড়েছে; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
বিজেপি ঠিক কোন পথে হাঁটতে যাচ্ছে, তা দিল্লির রাজনীতিতে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। জেনজি আন্দোলনের এই অভূতপূর্ব ঝড়ে নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক কৌশল ডুবতে বসেছে। রাজপথের বৈপ্লবিক অসন্তোষের কারণে ভারতের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে গণঅনাস্থা।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের রাজনীতিতে দলীয় মেরুকরণ ভেঙে পড়েছে। ফলে দেশটির প্রচলিত নির্বাচনী রাজনীতিতে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সিজেপি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির আড়ালে অবিচারের চর্চাকে বিশ্বের মানুষের সামনে খুলে দিয়েছে।
বিজেপির রাজনৈতিক পরাজয়
ফরেন পলিসি লিখেছে, জেনজি নেতৃত্বাধীন ককরোচ আন্দোলন শুধু একটি অনিয়মের প্রতিবাদ নয়; এটি মোদি সরকারের বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে বিজেপির প্রচারযন্ত্র ও মোদির ‘অজেয়’ ভাবমূর্তি তরুণ প্রজন্মের সামনে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে জানা যায়, ভারতের এখন ২৫ বছরের নিচের প্রায় ৪০ শতাংশ স্নাতক বেকার। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী শ্রমশক্তিতে থাকা স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ।
এই বাস্তবতা জাত, শ্রেণি, অঞ্চল ও ধর্মের বিভাজন অতিক্রম করে একটি সাধারণ অসন্তোষ তৈরি করেছে। যা ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের রাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক ব্যর্থতাকেই কেন্দ্রে আনছে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, মোদি দীর্ঘদিন নিজেকে সব সাফল্যের একক কারিগর হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু এখন তরুণদের ক্ষোভ বাজার বা প্রতিষ্ঠানের বদলে সরাসরি মোদির দিকেই ঘুরে যাচ্ছে। প্রতিবাদের কটূক্তি ও উপহাস তার গড়ে তোলা কর্তৃত্বের আবরণ ভাঙছে।
ফরেন পলিসি সতর্ক করেছে, মোদির উচিত জনমতের বার্তা গ্রহণ করা। নইলে ভারতে হয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটবে, নয়তো আরও গভীর ডিজিটাল-স্বৈরতান্ত্রিক পথে যেতে পারে।
গণমাধ্যমটির বক্তব্য, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, তরুণদের ক্ষোভ, প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস ও জোটের অস্থিরতা একসঙ্গে চাপ তৈরি করছে। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন মোদির জন্য কঠিনতর হতে পারে।