যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পার হওয়ার পর, ইরানের ক্ষমতার শীর্ষে এখন আর আগের মতো কোনো অবিসংবাদিত ধর্মীয় সালিশ বা একক সিদ্ধান্তদাতা নেই। দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্যে এই আকস্মিক পরিবর্তন তেহরানের অবস্থানকে আরও কঠোর করে তুলছে, যা ওয়াশিংটনের সাথে পুনরায় শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনার ভাগ্য নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা থাকতো একজন ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতার হাতে। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম দিনেই আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং তাঁর আহত পুত্র মোজতবার ক্ষমতা গ্রহণ এক ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। বর্তমান ব্যবস্থাটি মূলত ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডারদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার মতো কোনো একক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব নেই।

মোজতবা খামেনি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থার শীর্ষে থাকলেও অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, তাঁর ভূমিকা এখন অনেকটা নিজের জেনারেলদের নেওয়া সিদ্ধান্তে বৈধতা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ; তিনি নিজে সরাসরি কোনো নির্দেশনা দিচ্ছেন না।
ইরানি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের চাপের কারণে ক্ষমতা এখন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এসএনএসসি), সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় এবং আইআরজিসির একটি কট্টরপন্থী বলয়ের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে। আইআরজিসি এখন একাধারে সামরিক কৌশল এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—উভয় ক্ষেত্রেই আধিপত্য বিস্তার করছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইসলামাবাদে চলমান শান্তি আলোচনার বিষয়ে অবগত পাকিস্তানের একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ইরানিদের প্রতিক্রিয়া খুবই ধীর গতির। সেখানে বর্তমানে কোনো একক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমান্ড কাঠামো নেই। মাঝে মাঝে একটি বার্তার উত্তর দিতে তাদের দুই থেকে তিন দিন সময় লেগে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার ক্ষেত্রে মূল বাধা তেহরানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নয়; বরং ওয়াশিংটন যা দিতে প্রস্তুত এবং আইআরজিসির কট্টরপন্থীরা যা গ্রহণ করতে রাজি, এই দুইয়ের মধ্যবর্তী বিশাল ব্যবধানই হলো প্রধান অন্তরায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় ইরানের কূটনৈতিক মুখ হিসেবে কাজ করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সম্প্রতি তাঁর সাথে যোগ দিয়েছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফ। সাবেক এই আইআরজিসি কমান্ডার ও তেহরানের মেয়র যুদ্ধের এই সময়ে ইরানের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় এলিটদের মধ্যে প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তবে, মাঠ পর্যায়ে ইরানের মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আইআরজিসি কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদির নাম উঠে এসেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধের শুরুতে ইসরাইলি ও মার্কিন হামলায় মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হন এবং তাঁর শরীরের কিছু অংশ বিকৃত হয়ে যায়। নিরাপত্তা সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি জনসমক্ষে আসছেন না এবং আইআরজিসি সহযোগীদের মাধ্যমে বা সীমিত অডিও লিংকের সাহায্যে যোগাযোগ রক্ষা করছেন।
নেপথ্য ক্ষমতার চাবিকাঠি এখন সমরনায়কদের হাতে
ইরান গত সোমবার ওয়াশিংটনের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব জমা দিয়েছে। সূত্রের খবর অনুযায়ী, তেহরান ধাপে ধাপে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে যুদ্ধ শেষ না হওয়া এবং পারস্য উপসাগরের জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত বিবাদ মিটে না যাওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক ইস্যুটিকে সরিয়ে রাখার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন শুরু থেকেই পারমাণবিক ইস্যু সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আয়ার বলেন, আপাতত কোনো পক্ষই নমনীয় হতে চাইছে না। ইরান মনে করছে হরমজ প্রণালীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনকে দুর্বল করবে, আর ওয়াশিংটন মনে করছে অর্থনৈতিক অবরোধ ও চাপ ইরানকে নতজানু করবে।
মোজতবা খামেনি কাগজে-কলমে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হলেও আসলে তিনি এখন ‘সম্মতি প্রদানকারী’ এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। প্রকৃত ক্ষমতা এখন এসএনএসসি-র ওপর ভিত্তি করে গঠিত একটি যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের হাতে চলে গেছে। বিশ্লেষক আরশ আজিজির মতে, মোজতবা কখনোই জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন না, বিশেষ করে যারা সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনা করছেন তাদের বিরুদ্ধে যাওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব।
ধর্মীয় শাসন থেকে নিরাপত্তা কাঠামোর আধিপত্য
বর্তমানে ইরানের নীতি নির্ধারণে মধ্যপন্থী বা কট্টরপন্থীদের মধ্যে কোনো লড়াই নেই; লড়াইটি এখন কট্টরপন্থী এবং আরও চরম কট্টরপন্থীদের মধ্যে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের ক্ষমতা কাঠামো এখন ‘ঐশ্বরিক শক্তি’ থেকে ‘কঠিন শক্তিতে’ রূপান্তরিত হয়েছে। ধর্মীয় নেতাদের প্রভাব ছাপিয়ে এখন রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের প্রভাবই সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রবল সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও নয় সপ্তাহব্যাপী এই যুদ্ধে ইরান এখন পর্যন্ত ভেঙে পড়া বা আত্মসমর্পণের কোনো লক্ষণ দেখায়নি। বরং আইআরজিসি এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এখন শুধু যুদ্ধ পরিচালনা করছে না, বরং তারাই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তাদের কৌশলগত লক্ষ্য এখন স্পষ্ট—পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়িয়ে চলা, হরমজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং এই সংঘাত থেকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে বেরিয়ে আসা।
সূত্র: রয়টার্স