পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অশান্ত প্রদেশ বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটায় সামরিক সদস্যদের বহনকারী একটি ট্রেনে ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। রোববারের এই রক্তক্ষয়ী হামলায় কমপক্ষে ২৪ জন নিহত এবং আরও ৭০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন।
বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, ট্রেনটির কয়েকটি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং আশপাশের এলাকায় এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিসহ পাকিস্তানের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কোয়েটার চমন ফাটক এলাকার রেললাইনের পাশে এই আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। কোয়েটা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার দিকে ধাবমান ‘জাফর এক্সপ্রেস’ নামের ট্রেনটিতে বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য ছিলেন।
বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি নিয়ে এক আত্মঘাতী হামলাকারী আচমকা সেনা বহনকারী ট্রেনের বগিতে জোরালো ধাক্কা দিলে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে কয়েক মাইল দূর থেকেও এর বিকট শব্দ শোনা গেছে এবং এর ধাক্কায় ট্রেনের একটি বগি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে কয়েকটি কামরায় আগুন ধরে যায়।

বিস্ফোরণের পরপরই পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং আশপাশে ভারী গোলাগুলির শব্দও শোনা যেতে থাকে। এই হামলায় ট্রেনের সেনাসদস্যদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া রেললাইনের আশপাশের বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি ও যানবাহন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনার পরপরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুরো এলাকা কর্ডন করে বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বগিগুলোর ভেতরে কেউ আটকে আছেন কি না, তা কেটে দেখার কাজ চলছে। আহতদের উদ্ধার করে কোয়েটার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে রেড অ্যালার্ট বা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

এদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন- বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) মজিদ ব্রিগেড স্থানীয় গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে এই আত্মঘাতী হামলার দায় স্বীকার করেছে। সংগঠনটি দাবি করেছে, কোয়েটা ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাসদস্যদের বহনকারী নির্দিষ্ট বগিগুলোকে লক্ষ্য করেই তাদের আত্মঘাতী স্কোয়াড এই হামলাটি চালিয়েছে। বেলুচিস্তান প্রাদেশিক স্বরাষ্ট্র বিভাগের বিশেষ সহকারী বাবর ইউসুফজাই জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করছে এবং পুলিশ বিস্ফোরণের প্রকৃত ধরন ও নিরাপত্তা ত্রুটির বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
উল্লেখ্য, জাফর এক্সপ্রেস ট্রেনটি বেলুচিস্তানের কোয়েটা থেকে খাইবার পাখতুনখোয়ার পেশোয়ার পর্যন্ত চলাচল করে এবং গত দুই বছরে এই ট্রেনটি একাধিকবার বালোচ বিদ্রোহীদের হামলার শিকার হয়েছে। গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে এই ট্রেনে হামলার ঘটনা ঘটেছিল।

এর আগে গত বছরের মার্চে বালোচ বিদ্রোহীরা জাফর এক্সপ্রেসের যাত্রীদের জিম্মি করলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ২৬ সেনাসদস্য ও ৩৩ বিদ্রোহী নিহত হন। খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তান প্রদেশটি দীর্ঘদিন ধরেই স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে এমন বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতায় অস্থিতিশীল। বিশেষ করে অঞ্চলটি বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পের অন্যতম প্রধান রুট হওয়ায় এখানে প্রায়শই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে টার্গেট করে হামলা চালানো হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি-এনডিটিভি