বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো কোভিড-১৯ মহামারির স্মৃতি এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। এর মধ্যেই ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে নতুন করে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন দেশটির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাদের মতে, বর্তমান সংক্রমণ নতুন কোনো মহামারির ইঙ্গিত নয়, বরং এটি এখন একটি এন্ডেমিক রোগের মতোই সময়ে সময়ে ফিরে আসছে।
ভারতের গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্ধ্রপ্রদেশে ৮ জনের শরীরে কোভিড ১৯ শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজ্যজুড়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে পৃথক ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী ওডিশাও অন্ধ্রপ্রদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করেছে।
মুম্বাইয়ের গ্লেনইগলস হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট, চেস্ট ফিজিশিয়ান ও ব্রঙ্কোস্কোপিস্ট ডা. হরিশ চাপলে বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বর্তমান কোভিড সংক্রমণ মৃদু ধরনের এবং খুব কম রোগীকেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। তবে বয়স্ক ব্যক্তি ও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জটিল রোগে ভোগা রোগীদের বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করা উচিত।’
প্রথম মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে গত ২৮ জুন। ৬০ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি গুরুতর ফুসফুসের সংক্রমণ, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ একাধিক জটিল রোগে ভুগছিলেন। মৃত্যুর পর করা আরটি পিসিআর পরীক্ষায় তার শরীরে কোভিড ১৯ শনাক্ত হয়।
দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনা অন্ধ্রপ্রদেশের কড়াপা জেলার ৪৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তির। গুরুতর ফুসফুসের সংক্রমণজনিত জটিলতায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরে তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নমুনা পরীক্ষা করলে ৪০ জনের মধ্যে ৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়।
এদিকে মুম্বাইয়ের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কুমার শানুর ছেলে জান কুমার শানুও কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ১২ জুলাই পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং বর্তমানে সুস্থতার পথে রয়েছেন।
নয়াদিল্লির সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রধান ও কনসালট্যান্ট ডা. অঙ্কিতা বৈদ্য বলেন, ‘কোভিড ১৯-এর প্রাথমিক উপসর্গ অনেকটাই সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো। এসব উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, কাশি, সর্দি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ও পেশিতে ব্যথা সেই সঙ্গে ডায়রিয়া।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি জ্বর বা সর্দি-কাশিই যে কোভিড, তা নয়। উপসর্গ থাকলে অন্যদের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।’
যাদের ঝুঁকি বেশি
গুরগাঁওয়ের শালবি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের পালমোনোলজি বিভাগের প্রধান ডা. শিবা কল্যাণের মতে, অধিকাংশ মানুষের শরীরে পূর্ববর্তী সংক্রমণ বা টিকার মাধ্যমে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে বর্তমান ভ্যারিয়েন্ট অনেকের ক্ষেত্রে মৌসুমি ফ্লুর মতো হালকা উপসর্গ সৃষ্টি করছে। তবে নিচের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি:
দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি
কিডনি, ফুসফুস, লিভার বা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী
৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ
ক্যানসারের চিকিৎসাধীন ব্যক্তি
দীর্ঘদিন স্টেরয়েড সেবনকারী বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন ব্যক্তি
বর্ষায় কি করোনা সংক্রমণ বাড়ে?
ভারতীয় চিকিৎসক ডা. যতীন আহুজার মতে, বর্ষাকাল এলেই কোভিড ১৯ সংক্রমণ বেড়ে যায়, বিষয়টি এমন নয়। তিনি বলেন, বৃষ্টির সময় মানুষ দীর্ঘক্ষণ ঘরের ভেতরে অবস্থান করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় বাতাস চলাচল কমে যায়। এতে শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ অন্যান্য মৌসুমি ভাইরাসও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কোভিড ১৯ ও সাধারণ ফ্লুর উপসর্গ আলাদা করতে সময় লাগে।
তিনি পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল নিশ্চিত করা, নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখা, উপসর্গ থাকলে জনসমাগমে মাস্ক ব্যবহার করা এবং বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।