আন্তর্জাতিক

যুদ্ধের অবসান, নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা ইরানের

সব উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। গত বুধবার ডিজিটাল পদ্ধতিতে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট এতে সই করেন। এর মধ্য দিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের অবসান ঘটল। ইরানের কর্মকর্তারা একে ‘কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এদিকে এ নিয়ে ওয়াশিংটনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।

দুই দেশের হাতে এখন ৬০ দিন সময় রয়েছে চূড়ান্ত চুক্তিতে আসার জন্য। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারকে উল্লিখিত ১৪ দফা গত বুধবার থেকে কার্যকর হওয়া শুরু হয়েছে।

ইরানের কর্মকর্তাদের দাবি, তেহরান দৃঢ়তার অবস্থান থেকে আলোচনা চালিয়েছে এবং ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বড় ছাড় আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ এ সমঝোতাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের আত্মসমর্পণের প্রমাণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। গত বুধবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত  সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার রেকর্ড। মানুষ এটি দেখবে এবং বিচার করবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবর বলছে, ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ান ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এ সময় পেজেশকিয়ান ইরানে থাকলেও ট্রাম্প ছিলেন ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে। সেখানে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেওয়ার আগে তিনি এতে স্বাক্ষর করেন। পরে সে ছবি প্রকাশ করা হয়।

এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানকে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র পেতে দেবেন না। তবে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের দিনটিতে ট্রাম্প জানান, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র না থাকাটা ‘অন্যায্য’ হবে।

সমঝোতা স্মারকে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি তেহরানের পক্ষ থেকে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রাথমিক চুক্তি চূড়ান্ত নয় এবং এটি ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার বোমা বর্ষণে ফিরে যেতে পারে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করা সমঝোতা স্মারকটির ছবি সামাজিক মাধ্যম এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেছেন। এটিকে ‘ঐতিহাসিক নথি’ অভিহিত করে তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে শান্তি অর্জিত হবে। পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্মত হওয়া সমঝোতা স্মারক এমন একটি দেশের কণ্ঠস্বর তুলে ধরছে, যারা হুমকি ও চাপের মুখে আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতা বিলিয়ে দেয়নি। পরে সামাজিক মাধ্যমে আরেকটি পোস্টে ইরানের প্রেসিডেন্ট লেখেন, আজ যা হয়েছে, তা জাতীয় সহনশীলতা, রাজনৈতিক যৌক্তিকতা এবং দায়িত্বশীল কূটনীতির ফলাফল।

আলজাজিরার খবর বলছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নিজ দেশের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেন।

এর আগে জানা গিয়েছিল, ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হওয়ার পর (আজ) শুক্রবার দুই পক্ষের প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডে উপস্থিত হয়ে স্বাক্ষর করবে। দুই দেশের মধ্যে আজ বৈঠক শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানের কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে আলোচনার জন্য ইরান প্রতিনিধি দল পাঠাবে কিনা, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, শরিফ সুইজারল্যান্ড সফর পিছিয়ে দিয়েছেন। মূলত সমঝোতা স্মারক ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হওয়ায় এবং কার্যকরী হওয়ায় তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মুখপাত্র আরও জানান, পাকিস্তান পরবর্তী ধাপের আলোচনাগুলো বাস্তবায়নে কাজ করবে।

সমঝোতার প্রথম দফা অনুসারে এখন সব যুদ্ধক্ষেত্রে হামলা ও আক্রমণ থেমে যাওয়ার কথা। এমনকি এর আওতায় লেবাননও থাকার কথা। তবে গতকাল এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত লেবাননে হামলা থামায়নি ইসরায়েল। গতকাল সকালে চালানো হামলায় দেশটিতে তিনজন নিহত হয়েছেন। লেবাননে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। সেখানে ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলার পর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে– নিজ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ট্রাম্প আদৌ ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন কিনা।

খুলেছে হরমুজ প্রণালি
এদিকে সমঝোতার কিছু সুফল এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছে বিশ্ব। গতকাল কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাধা ছাড়াই তেল পারাপার করেছে সৌদি আরব। রয়টার্সের খবর বলছে, সৌদি আরবের পতাকাবাহী তিনটি সুপারট্যাঙ্কার ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে গতকাল হরমুজ প্রণালি পার হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গতকাল জানান, সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর এক কোটি ২৫ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হয়েছে।

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ওই প্রণালি দিয়ে যত জাহাজ পার হতো, এটি সে তুলনায় নগণ্য। রপ্তানিকারকরা বলছেন, নৌযান চলাচল যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে নিয়ে যেতে সময় লাগবে। এখনও এই জলপথে অনেক মাইন রয়েছে। সেগুলো পরিষ্কার করা প্রয়োজন। মাইন পরিষ্কারের কাজে এরই মধ্যে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের একাধিক দেশ। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া একান্তই তাদের দায়িত্ব। এ কাজে বাইরের কারও হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। বরং এ ধরনের কোনো হস্তক্ষেপ হলে তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।

রয়টার্সের খবর বলছে, যেসব জাহাজ এতদিন যুদ্ধের জন্য নিজেদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে অবস্থান গোপন রেখেছিল, সেগুলো তারা চালু করেছে। চেষ্টা করছে ওই প্রণালি দিয়ে নিরাপদে বের হয়ে আসতে।

সাম্প্রতিক সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঐতিহাসিক চুক্তি সই, খুলছে হরমুজ প্রণালী

Newsdesk

যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতা স্মারকে সই করলেন ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ান

Newsdesk

ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তির ১৪ দফা প্রকাশ করল হোয়াইট হাউস

Newsdesk