মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ ঘিরে শুরু হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা ও নজিরবিহনী বিশৃঙ্খলা। একদিকে ইরান এই পথ খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েও পুনরায় সামরিক কড়াকড়ি আরোপ করেছে, অন্যদিকে সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে গুলিবর্ষণের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। বর্তমানে এই জলপথে হাজার হাজার জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য এক অশনিসংকেত। অন্যদিক, নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, শনিবার ওমান উপকূল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে একটি তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে ইরানি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) গানবোট থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন জানান, কোনো ধরনের আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই দুটি গানবোট তাদের ধাওয়া করে এবং গুলি চালায়। যদিও ক্রু ও জাহাজটি নিরাপদ আছে বলে জানানো হয়েছে, তবে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক শিপিং সেক্টরে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানি গানবোট থেকে গুলিবর্ষণের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দ্বিতীয় আরেকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওমান উপকূল থেকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি কন্টেইনার জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জাহাজের বেশ কিছু কন্টেইনারের ক্ষতি হলেও কোনো আগুন বা পরিবেশগত বিপর্যয়ের খবর পাওয়া যায়নি। কারা এই হামলার জন্য দায়ী, সে বিষয়ে ইউকেএমটিও নির্দিষ্ট করে কিছু না জানালেও বর্তমানে ঘটনার তদন্ত চলছে।
ইরানি বিপ্লবী গার্ডের গানবোট থেকে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে গুলিবর্ষণের ঘটনার পরপরই এই দ্বিতীয় হামলাটি চালানো হয়। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়ার পর তেহরান যখন এই কৌশলগত জলপথে পুনরায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, ঠিক সেই উত্তাল সময়ের মধ্যেই এই দুটি হামলার ঘটনা ঘটল।

গেলো শুক্রবার লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবার পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ঘোষণা করেন, হরমুজ প্রণালী সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে ‘ধন্যবাদ’ দিলেও স্পষ্ট করে দেন যে, ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকবে। ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থানের পর ইরানও তাদের অবস্থান থেকে সরে আসে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ করায় তারা পুনরায় এই রুটে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি আরোপ করেছে।
লাইভ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার পথে থাকা অসংখ্য জাহাজ এখন মাঝপথ থেকে ফিরে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের পতাকাবাহী দুটি জাহাজ, পণ্যবাহী ‘জগ অর্ণব’ এবং তেলবাহী ট্যাংকার ‘সানমার হেরাল্ড’ লারক দ্বীপ অতিক্রম করার সময় ইরানি বাহিনীর বাধার মুখে পড়ে এবং ইউ-টার্ন নিতে বাধ্য হয়। একইভাবে কাতার থেকে ভারতের পথে থাকা এলএনজি ও অপরিশোধিত তেলবাহী বেশ কিছু জাহাজও এখন মাঝসমুদ্রে দিক পরিবর্তন করছে।

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় একটি অংশ এই সরু প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে হাজার হাজার জাহাজ আটকা পড়ে থাকায় জ্বালানি বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, তেল ও গ্যাসের দাম দীর্ঘ সময় চড়া থাকতে পারে। সৌদি আরব, কুয়েত ও ইরাকের মতো তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য এই পথ বন্ধ থাকা মানে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা।
আইআরজিসি জানিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত ইরানি জাহাজগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ থাকবে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালীতে আগের মতোই কঠোর বিধিনিষেধ বহাল থাকবে। এখন থেকে এই পথ দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজকে পূর্ণ তথ্য প্রদান, ট্রানজিট সার্টিফিকেট গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স-আল জাজিরা-বিবিসি-সিএনএন