ইরান যদি দ্রুত কোনো চুক্তিতে না পৌঁছায়, তবে দেশটির বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত চলবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ। বৃহস্পতিবার পেন্টাগনের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তেহরান যদি ভুল পথ বেছে নেয়, তবে তারা শুধু অবরোধই নয়, বরং তাদের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি খাতের ওপর ভয়াবহ বোমা হামলার সম্মুখীন হবে।
প্রতিরক্ষা সচিব হেগসেথ দাবি করেন, বর্তমানে চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইরান তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনাগুলো থেকে ক্ষেপণাস্ত্র এবং লাঞ্চার উদ্ধারের চেষ্টা করছে। তিনি ইরানি নেতাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা যখন ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে পুরোনো সরঞ্জাম বের করছেন, আমরা তখন আরও শক্তিশালী হচ্ছি।
তাঁর মতে, ইরানের বর্তমান প্রতিরক্ষা শিল্পের এমন সক্ষমতা নেই যে তারা ধ্বংস হওয়া সামরিক সরঞ্জামগুলো পুনরায় তৈরি বা প্রতিস্থাপন করতে পারে। স্যাটেলাইট চিত্রেও মাটির নিচ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চার উদ্ধারের জন্য আর্থ-মুভিং ইক্যুইপমেন্ট ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
চীন ইরানকে নতুন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা অস্ত্র সরবরাহ করতে পারে বলে যে গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়া গিয়েছিল, সে প্রসঙ্গে হেগসেথ বলেন, বেইজিং এমন কিছু করবে না বলে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ব্যক্তিগতভাবে পত্র বিনিময় করেছেন। ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি চিঠির মাধ্যমে শি জিনপিংকে ইরানকে অস্ত্র না দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন এবং জবাবে চীনা প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন যে তিনি এমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। আগামী মে মাসে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কথা রয়েছে।

নৌ-অবরোধ ও শক্তির প্রয়োগ: জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, ইরানের জলসীমায় বা আন্তর্জাতিক জলসীমায় যে কোনো দেশের জাহাজ যদি এই অবরোধ অমান্য করার চেষ্টা করে, তবে মার্কিন বাহিনী প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করবে।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ১৩টি জাহাজ মার্কিন সতর্কতা শোনার পর ফিরে যাওয়ার বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্কিন কমান্ডের পক্ষ থেকে জাহাজগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে, অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করবেন না। নির্দেশ অমান্য করলে জাহাজে তল্লাশি চালানো হবে অথবা বলপ্রয়োগ করা হবে।
অন্যান্য অঞ্চলেও সক্রিয় হবার হুশিয়ারী: জেনারেল ড্যান কেইন সাংবাদিকদের জানান, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে কোনো দেশ যদি ইরানকে ‘বস্তুগত সহায়তা’ প্রদান করে, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী সেই দেশের জাহাজগুলোকে ধাওয়া করবে। তিনি বলেন, চলমান এই নৌ-অবরোধের পাশাপাশি আমাদের যৌথ বাহিনী প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও সক্রিয় থাকবে।
তিনি আরও বলেন, ইরান-পতাকাবাহী কোনো জাহাজ বা ইরানকে বস্তুগত সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে এমন যেকোনো জাহাজকে আমরা সক্রিয়ভাবে খুঁজে বের করব এবং ধাওয়া করব। এই অভিযানের আওতায় ইরানের তেল বহনকারী তথাকথিত ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা রহস্যময় জাহাজগুলোও থাকবে। ডার্ক ফ্লিট বলতে সেসব জাহাজকে বোঝায় যেগুলো আন্তর্জাতিক আইন, নিষেধাজ্ঞা কিংবা বিমার শর্তাবলি ফাঁকি দিয়ে চলাচল করে।
জেনারেল কেইন জানান, এই বিশাল মিশনে বর্তমানে ১০ হাজার নৌ-সেনা, এক ডজনেরও বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং কয়েক ডজন সামরিক বিমান নিয়োজিত রয়েছে।

মার্কিন বাহিনীর প্রস্তুতি: ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা এই যুদ্ধবিরতির সময়টিকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, আমাদের সেনারা অত্যন্ত অনুপ্রাণিত। তারা এই সময়ে পুনরায় অস্ত্রসজ্জিত হচ্ছে এবং যুদ্ধকৌশল ও পদ্ধতিগুলোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনছে। তাঁর মতে, বিশ্বের যে কোনো সামরিক বাহিনীর চেয়ে মার্কিন বাহিনী দ্রুত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম এবং তারা এখন সেই প্রস্তুতিই নিচ্ছে।
পেন্টাগনের এই সামগ্রিক অবস্থান থেকে স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র শুধু আলোচনার টেবিলে নয়, বরং রণক্ষেত্রেও ইরানকে সর্বোচ্চ চাপে রাখতে চাইছে। একদিকে নৌ-অবরোধের মাধ্যমে অর্থনৈতিক টুঁটি চেপে ধরা এবং অন্যদিকে সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের মাধ্যমে তেহরানকে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে বাধ্য করাই এখন ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য।
তথ্যসূত্র: সিএনএন-মিডল ইস্ট আই