শিক্ষাঙ্গনসর্বশেষ

এক রাতেই মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের ৪৬ শিক্ষককে বদলি!

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মূল শাখা থেকে একযোগে ৪৬ শিক্ষককে অন্য শাখায় বদলি করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে আকস্মিকভাবেই এসব শিক্ষকের বদলির আদেশ জারি করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। বদলি হওয়া শিক্ষকদের মতিঝিল মূল শাখা থেকে বনশ্রী ও মুগদা শাখার বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বলছে, পাঠদানের মানোন্নয়ন, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট দূর করা এবং বিভিন্ন শাখার মধ্যে শিক্ষক সমন্বয়ের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যদিও বদলি হওয়া কয়েকজন শিক্ষক এ সিদ্ধান্তের সময়, প্রক্রিয়া ও কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, বদলির পেছনে প্রশাসনিক কারণের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনাও থাকতে পারে। কেউ কেউ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষও তা অস্বীকার করেছে।

জানতে চাইলে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক লাল মোহাম্মদ সোমবার বলেন, ‘অন্য ব্রাঞ্চে শিক্ষক সংকট থাকার কারণে মতিঝিল ব্রাঞ্চ থেকে ৪৩ জনকে অন্য ব্রাঞ্চগুলোতে ট্রান্সফার করা হয়েছে।’

প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেওয়া এক ব্যাখ্যায়ও বলা হয়েছে, ২২ আগস্ট গভর্নিং বডির সভায় পাঠদানে অধিকতর উৎকর্ষ ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে ৪৩ শিক্ষককে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ঘাটতি ও বিভিন্ন শাখার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনেও এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যদিও বিভিন্ন সূত্রে বদলি হওয়া শিক্ষকের মোট সংখ্যা ৪৬ বলে জানা গেছে।

রাতের আদেশে ক্ষোভ
বদলি হওয়া একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ বদলির আদেশ হাতে পান তারা। একসঙ্গে এতসংখ্যক শিক্ষককে বদলির ঘটনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

একজন নারী শিক্ষক বলেন, ‘একসঙ্গে ৪৬ জন শিক্ষককে বদলি করার ঘটনা আইডিয়ালের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সামনে বার্ষিক পরীক্ষা। এ সময়ে এত শিক্ষককে বদলি করলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে এর প্রভাব পড়বে কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার ছিল।’

বদলি হওয়া শিক্ষকদের একটি অংশ সোমবার চিবালয়ে গিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন।

শিক্ষকদের অভিযোগ, বদলির বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশের আগেই অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ করেন। ফলে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের তথ্য কীভাবে আগে বাইরে গেল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

‘দুর্নীতির মূল উৎপাটনের উদ্যোগ’
বদলি নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক লাল মোহাম্মদ। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির পরিবেশ দূর করার অংশ হিসেবেই শিক্ষক বদলির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অধ্যক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বদলি হওয়া শিক্ষকদের অনেকেই পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে মতিঝিল মূল শাখায় দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দীর্ঘদিন একই শাখায় দায়িত্ব পালনের কারণে প্রশাসনিক ভারসাম্য ও শিক্ষক বণ্টনের বিষয়টি পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।

তবে শিক্ষকদের একাংশের প্রশ্ন, যদি দীর্ঘদিন একই শাখায় দায়িত্ব পালনই বদলির অন্যতম কারণ হয়, তাহলে এ বিষয়ে সবার জন্য একটি সুস্পষ্ট ও অভিন্ন নীতিমালা করে বদলি করা যেত।

অভিভাবকদের ভিন্ন প্রস্তাব
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবীর দুলু বলেন, একটি শাখায় কোনো শিক্ষকের চাকরির মেয়াদ তিন বছর পূর্ণ হলে তাকে অন্য শাখায় বদলির একটি নিয়ম চালু করা যেতে পারে। তবে সেই নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এভাবে নিয়ম চালু করা গেলে কেউ দীর্ঘদিন একই শাখায় থেকে কোচিং বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য ও টিউশন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়াতে পারবেন না। তবে ক্ষমতার কারণে কেউ বদলি হবেন আর কেউ থেকে যাবেন- এমন বৈষম্যও যেন না হয়। সবার জন্য একই নিয়ম কার্যকর করতে হবে।’

অভিভাবকদের মতে, শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের পছন্দ-অপছন্দ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজন এবং প্রশাসনিক নীতিমালাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ
বদলি হওয়া কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, তাদের কারও কারও রাজনৈতিক মতাদর্শ বিবেচনায় নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগও ছড়িয়ে পড়েছে।

এসব অভিযোগের মধ্যে কয়েকজন শিক্ষকের রাজনৈতিক পরিচয়, বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, নিয়োগ ও বদলি নিয়ে আর্থিক লেনদেন এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ স্থানান্তর সংক্রান্ত নানা দাবি করা হয়েছে।

অভিভাবকরা বলছেন, এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে ৪৬ শিক্ষক বদলির প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ওপর নয়, শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনার ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে বদলি হওয়া শিক্ষকরা কোন কোন শ্রেণি ও বিষয়ে পাঠদান করতেন, তাদের পরিবর্তে নতুন শিক্ষক কখন দায়িত্ব নেবেন এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় কোনো বিঘ্ন ঘটবে কিনা- এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ।

সামনে বার্ষিক পরীক্ষা থাকায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে শিক্ষক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে শিক্ষার মান বাড়বে, তাহলে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা যাতে দ্রুত ক্লাসে যোগ দিতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় কোনো ঘাটতি তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন নিয়েও প্রশ্ন
প্রতিষ্ঠানের একটি সূত্রের বরাতে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, গভনিং বডির নতুন সভাপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি সরকারি ব্যাংকের কমলাপুর শাখায় প্রতিষ্ঠানটির একাউন্ট থেকে থেকে অন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাহজাহানপুর শাখায় ৪৬ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। ৪৬ শিক্ষককে বদলি করা নিয়েও আর্থিক লেনদেনের ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে।

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিনটি শাখা- মতিঝিল, বনশ্রী ও মুগদা। এসব শাখায় বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনে প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ৭০০ জন এবং কর্মচারী দুই শতাধিক।

সাম্প্রতিক সংবাদ

খাবার পানি নিয়ে ভয়ংকর তথ্য দিল আইসিডিডিআর,বি

Newsdesk

দলের নাম ভাঙিয়ে অনিয়ম করলে কঠোর ব্যবস্থা: রিজভী

Newsdesk

যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এলএনজি কেনার অনুমতি দিলো সরকার

Newsdesk