সুপেয় পানির সংকট এবং তার ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সামনে এসেছে ভয়ংকর তথ্য। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, খাবার পানির উচ্চ লবণাক্ততা বাড়িয়ে তুলছে উপকূলীয় মানুষের হৃদরোগের ঝুঁকি।
অতীতের রেকর্ড ভেঙে খুলনার কয়রায় ৫৫ শতাংশের বেশি খাবার পানির উৎসে মিলেছে লবণ। পাশের আশাশুনি উপজেলায় এ হার ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথভাবে চল্লিশোর্ধ্ব প্রায় ১৬ হাজার মানুষের ওপর গবেষণা করে এ তথ্য জানিয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীতে আইসিডিডিআর,বির সাসাকাওয়া মিলনায়তনে ‘পানীয় জলের লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: বাংলাদেশের প্রমাণ ও নীতিগত সুপারিশ’ শীর্ষক সেমিনারে গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় কয়রা ও আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন ১৭২টি গ্রামের ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস জরিপ করা হয়। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ উৎসের পানি খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। এসব পানির উৎসের লবণাক্ততা বিশ্লেষণে উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির সংকটের চিত্র উঠে আসে।
গবেষণার আরেক অংশে দুই উপজেলার ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জনের হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়।
এতে দেখা যায়, তাদের ২১ দশমিক ৬ শতাংশের আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কয়রায় এ হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
সেমিনারে আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. আলিয়া নাহিদ বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততা এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পানির মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি হৃদ্রোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গর্ভাবস্থায় নারীদের ক্ষেত্রেও এর বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গবেষণার ভিত্তিতে কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার ও টিউবওয়েল ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পানির উৎসের ডিজিটাল রেজিস্ট্রি তৈরি ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ শনাক্ত করতে স্ক্রিনিং, রেফারেল, চিকিৎসা ও ফলোআপে ডিজিটাল সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও সেমিনারে জানানো হয়।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিইনিস বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততার ক্ষেত্রে এখনো সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যভিত্তিক মাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি। সোডিয়ামসহ অন্যান্য খনিজ উপাদানের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা চলছে।
অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসের কারণে পুকুর ও অগভীর ভূগর্ভস্থ পানিতে দীর্ঘ সময় লবণাক্ততা থাকতে পারে। এ কারণে দুর্যোগের পর দ্রুত পানির উৎস পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি উপকূলীয় বাঁধ ও পোল্ডারের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, নিরাপদ খাবার পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও কমিউনিটির অংশগ্রহণকে একীভূত করে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সমাধান খুঁজতে কাজ করছে আইসিডিডিআর,বি।
সেমিনারে পানির গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, খাবার পানিতে সোডিয়ামের স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং নিরাপদ পানির কার্যক্রমকে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।