কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি থাকলেও চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে নির্ধারিত কার্গো পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে বাংলাদেশ। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাতারের সঙ্গে আলোচনা করতে দেশটিতে সফর করছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে তিনি মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) কাতার পৌঁছেছেন। দুদিনের এ সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি জ্বালানি সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানিয়েছে সূত্র।
বুধবার (১৯ আগস্ট) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার একাধিক সূত্র জাগো নিউজকে প্রতিমন্ত্রীর সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি৷
সূত্র জানায়, প্রতিমন্ত্রীর সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো কাতার থেকে কীভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে এলএনজি পাওয়া যায়, সে বিষয়ে দেশটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আটকে থাকা এলএনজি কার্গো দ্রুত পাওয়ার সম্ভাবনা, সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সময়সূচি এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। ফলে এলএনজি সরবরাহে যে কোনো ধরনের বিঘ্ন সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও অন্যান্য খাতে প্রভাব ফেলছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী কতারে গিয়েছেন৷ সেখানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন৷
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেট্রোবাংলার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিমন্ত্রী কাতার সফর করছেন৷ ইরান যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও বাংলাদেশ আর কাতার থেকে এলএনজি পায়নি৷ কারণ, যুদ্ধে কাতারের অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিভাবে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এলএনজি পেতে পারে সে বিষয়ে আলোচনা করতে প্রতিমন্ত্রী কাতার গিয়েছেন৷
কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেটের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। তবে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় এতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
চলতি বছরের মার্চে পেট্রোবাংলা দুটি স্পট কার্গো কিনেছিল। একটির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক ২৮ ডলার এবং অন্যটির ২৩ দশমিক ৮ ডলার। অথচ জানুয়ারিতে স্পট মার্কেট থেকেই প্রায় ১০ ডলারের কাছাকাছি দামে এলএনজি কেনা হয়েছিল। অর্থাৎ, সরবরাহ সংকটের সময়ে একই পরিমাণ এলএনজি কিনতে কয়েক গুণ বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানিতে কাতার গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। ২০১৭ ও ২০২৩ সালে কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। ২০২৬ সাল থেকে নতুন চুক্তির আওতায়ও এলএনজি সরবরাহের কথা রয়েছে। তবে চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহনে বিঘ্নের কারণে কাতার এনার্জি বাংলাদেশের নির্ধারিত সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার কথা জানায়।
গত জুলাইয়ে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২৬ সালের জন্য কাতারের নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতার কারণে কাতার এনার্জি এলএনজি সরবরাহে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছিল। এতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ঘাটতি সামাল দিতে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কিনতে হয়েছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় দাম সাধারণত বেশি ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। একই সময়ে কাতার এনার্জি সরবরাহ সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্পট এলএনজি কার্গো কেনার উদ্যোগ নেয়।
তবে সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই। আগস্টে বাংলাদেশে আসার কথা থাকা চারটি এলএনজি কার্গোর এখনো নিশ্চিত সরবরাহের তারিখ পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় কাতার সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা। কারণ, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে কাতারের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহ যত দ্রুত স্বাভাবিক করা যাবে, ততই স্পট মার্কেটের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে নির্ধারিত কার্গো পাওয়ার বিষয়ে কাতারের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সময়সূচি ও বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়ে সমঝোতা হলে দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিতেও কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।