বাংলাদেশ

ইন্টার্নদের হাত ধরেই চিকিৎসায় বন্ধ হবে বিদেশমুখিতা

ঢাকা মেডিকেল কলেজকে দেশের ইতিহাসের ‘কালের সাক্ষী’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রেই নয়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে।

শনিবার (১১ জুলাই) ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ শুধু দেশ-বিদেশের সেরা চিকিৎসকই তৈরি করেনি; এ প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক, গবেষক, সমাজনেতা ও মুক্তিযোদ্ধাও তৈরি হয়েছেন, যাঁরা অন্যের জীবন রক্ষায় নিজেদের জীবন ও স্বার্থ বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে যাঁরা আর বেঁচে নেই, কিন্তু যাঁদের অবদানে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের সেবায় অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে, তাঁদেরও স্মরণ করেন তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে রাজধানীর মানুষের ‘সার্বক্ষণিক নির্ভরতার জায়গা’ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, হাসপাতালের প্রতিটি কক্ষ ও করিডোরে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের আনন্দ-বেদনার গল্প রচিত হয়। এখানে যেমন অনেক জীবনের অবসান ঘটে, তেমনি অসংখ্য নতুন জীবনেরও সূচনা হয়। স্টেথোস্কোপের এক প্রান্তে একজন চিকিৎসকের কান থাকে, অন্য প্রান্তে স্পন্দিত হয় একটি মানুষের জীবন। চিকিৎসক ও রোগীকে ঘিরে আবর্তিত হয় একটি পরিবারের অগাধ বিশ্বাস।

চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের মনোজগতে চিকিৎসকের অবস্থান সুস্থ জীবনের রক্ষক হিসেবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, চিকিৎসকেরাই প্রকৃত অর্থে মানুষের বিপদের বন্ধু। রোগে-শোকে কাতর মানুষের পরম বন্ধু হয়ে ওঠেন চিকিৎসকেরা। একজন চিকিৎসকের পরামর্শ ও আন্তরিক ব্যবহারও রোগীর কাছে ওষুধের মতো কার্যকর হয়ে ওঠে। তাই পেশাগত উৎকর্ষতার পাশাপাশি মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাও জরুরি।

হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদারে সরকার প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। এর অংশ হিসেবে হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণের জন্যও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

“প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।”-এই নীতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চায়। পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো বিষয়গুলোতে আগেভাগে স্বাস্থ্যসম্মত পরামর্শ পেলে রোগের নিরাময় অনেক সহজ হয়। নিয়মিত পরীক্ষা, সচেতনতা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক রোগ শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় সম্ভব।

এ লক্ষ্যেই সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী হেলথ কেয়ারার হবেন, যাঁরা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন। তিনি বলেন, একটি সুস্থ জাতি শুধু হাসপাতাল দিয়ে গড়ে ওঠে না; পারিবারিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, স্বাস্থ্য পরামর্শ, নিরাপদ খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম ও দায়িত্বশীল জীবনাচরণের ওপরও শারীরিক সুস্থতা নির্ভর করে।

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাখাতের পর এবার দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে এ বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শুধু বাজেট বাড়ানো নয়, বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও চিকিৎসা ব্যয়ও কমানো হয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, পেরিফেরাল ভাসকুলার স্টেন্ট, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন ফাইবার, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও কর কমানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের বিষয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের ৫০০ উপজেলার মধ্যে বর্তমানে মাত্র পাঁচটিতে ১০০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে। জনসংখ্যার তুলনায় এটি অপ্রতুল হওয়ায় রোগীদের শহরমুখী হতে হয়। এ কারণে বর্তমানে ৩১ থেকে ৫১ শয্যার প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সব হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকার হাসপাতালের ভবন নির্মাণ, স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের শিশুরাই আগামীর বাংলাদেশ। শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বিশেষায়িত শিশুচিকিৎসা রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজলভ্য হবে।

মেডিকেল শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে মেডিকেল বর্জ্যের বিজ্ঞানসম্মত অপসারণ ও ব্যবস্থাপনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সবাইকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে মেডিকেল বর্জ্য অপসারণ এবং হাসপাতালগুলো পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানান তিনি।

বক্তব্যের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, আজকের শিক্ষার্থী ও ইন্টার্নদের হাত ধরেই চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ হবে।

সাম্প্রতিক সংবাদ

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো জ্ঞানের বাতিঘর : তথ্যমন্ত্রী

Babul DRU

স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে রাজি ছিলেন না শেখ মুজিব, দিয়েছেন জিয়াউর রহমান: স্পিকার

Babul DRU

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা হচ্ছে, সহায়তা দেবে সরকার: কৃষিমন্ত্রী

Babul DRU