বাংলাদেশলন্ডন মিরর স্পেশাল

সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত হত্যাচেষ্টা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হাফেজ নাঈম বলির পাঠা : দাবি পরিবারের

ঢাকা অফিস :

আওয়ামীলীগ নেতা সুনামগঞ্জ-২ আসনের সাবেক এমপি ও রেলমন্ত্রী প্রয়াত সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের উপর ২২ বছর আগে দিরাইয়ে সমাবেশে গ্রেনেড হামলা ও হত্যাচেষ্টা মামলার রায়ে একমাত্র আসামি হাফেজ সৈয়দ নাঈম আহমদ আরিফকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত । বিএনপির মন্ত্রী এমপিসহ বাকি সবাইকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে।
তার বড় ভাইয়ের দাবি এই মামলায় হাফেজ নাঈম বলির পাঠা হয়েছেন।১৩৭ সাক্ষীর মধ্যে একজনও হাফেজ নাঈমের নামও উচ্চারণ করেনি। রায় ঘোষণার সময় পরিচয় পাওয়া না গেলেও পরে তার পরিচয় জানা গেছে।
মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত নাঈম একজন কোরআনে হাফেজ এবং আলেম। তিনি ক্ষমতাসীন বিএনপির জোটভুক্ত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ছাত্র সংগঠন ছাত্র জমিয়তের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন গ্রেফতারের আগে।

এই রায়ে ১০ আসামির ৯ জনকেই বেকসুর খালাস দেয়া হলেও একমাত্র হাফেজ নাঈমকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। রায়ের পরপরই হাফেজ নাঈমের মৃত্যুদন্ডাদেশ বাতিলের দাবিতে সিলেটে বিক্ষোভ প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে।

রায়ে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এমপি, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বর্তমান প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপি এবং জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গৌছ এমপিসহ অন্য নয় হেভিওয়েট রাজনৈতিক আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।

মামলার আরও দুই আসামি-জেএমবি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সী ও বিপুল-অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তাদের বিচারিক কার্যক্রম আগেই নিষ্পত্তি হয়েছে।

এছাড়া মামলায় পলাতক আসামি মাওলানা তাজ উদ্দিনসহ ৯ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

খালাসপ্রাপ্ত অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন, জেএমবি নেতা মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান (মফিজ/অভি), মুফতি মঈন উদ্দিন (আবু জান্দাল/মাসুম বিল্লাহ/খাজা), আব্দুল মাজেদ ভাট (ইউসুফ ভাট), নাজিউর রহমান নাজু (নাজমুল হক নাজু/নাজিমুল হক) প্রমুখ।

গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার বহুল প্রতীক্ষিত ও চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। বিএনপি সরকার গঠনের পর দেশে জঙ্গি হামলার চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত মামলার রায় হিসেবে এটিই প্রথম।

তবে এই রায়ে হাফেজ নাঈমকে মৃত্যুদন্ড ঘোষণার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে মুক্তি দাবি করেছে কওমী মাদ্রাসা ঘরনার ছাত্র সংগঠন ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ। ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি রিদওয়ান মাযহারী গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে হাফেজ সৈয়দ নাঈম আহমেদ আরিফের বিরুদ্ধে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কড়া ভাষায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।তিনি বলেছেন, সাজানো জঙ্গি মামলায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ
বেকসুর খালাস পেলেও হাফেজ নাঈমের মৃত্যুদন্ড মেনে নেয়া যায় না।
আর নাঈমের মুক্তি চেয়ে শুক্রবার (২৬ জুন) বাদ জুমা সিলেটে বিরাট বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্র জমিয়তের নেতাকর্মীরা। এরপর প্রায় প্রতিদিনই সিলেটে প্রতিবাদ বিক্ষোভ পালিত হচ্ছে । সোমবারও বাদ জোহর সাংস্কৃতিক সংগঠন রেনেসাঁস এর ডাকে সিলেটে বিরাট মানববন্ধন ও বিক্ষোভ প্রতিবাদ হয়েছে ।

কে এই হাফেজ নাঈম?
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাফেজ সৈয়দ নাঈম আহমদ আরিফের বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর এলাকায়। তার পিতার নাম সৈয়দ আবুল কালাম ও মাতা মোছা. সালমা খাতুন। নাঈম ছাত্রজীবনে সৈয়দপুর ইউনিয়ন ছাত্র জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এবং সৈয়দপুর মাদরাসায় জালালাইন জামাতের ছাত্র থাকাকালীন গ্রেফতার হোন। দীর্ঘ বিশ বছর জেল খেটে এক মাস আগে জামিনে মুক্তি পান তিনি। টগবগে হাফেজ নাঈম কারাগারে থাকাবস্থায় পিতামাতাসহ অনেক আত্মীয়-স্বজন হারিয়েছেন।

জামিনে বেরিয়ে হতাশা ঝেড়ে জীবন সংগ্রামে নামার স্বপ্ন বুনছিলেন তিনি। কিন্তু আজ আবার তাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনতে হলো।

গত দুই দশকে দেশের একাধিক বহুল আলোচিত ও হাই-প্রোফাইল বোমা হামলা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার মামলায় তার নাম জড়িয়েছে। এর মধ্যে সিলেটে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার মামলা (যেটিতে তিনি পরবর্তীতে খালাস পান), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশে বোমা হামলা, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর হামলা এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলাতেও নাঈম আহমদকে আসামি করা হয়েছিল। তবে দিরাইয়ের এই মামলাটিতেই প্রথম তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাজার রায় এলো।

পরিবারের দাবি নাঈম ‘বলির পাঠা’

রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাঈমের স্বজনেরা। তার ভাই সৈয়দ মারুফ আহমদ সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, আমার ভাইকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং ধর্মীয় লেবাসের কারণে বলির পাঠা বানানো হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে তার দূরতম কোন সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি বলেন,
মামলার ১৩৭ জন সাক্ষীর একজনও হাফেজ নাঈমের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি।তাহলে কিভাবে তাঁর এতো বড় রায় হলো?

পরিবারের দাবি দীর্ঘ ২০ বছর কারাভোগের পর সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন হাফেজ নাঈম।

দীর্ঘ বন্দিজীবনের ট্র্যাজেডি উল্লেখ করে তারা বলেন, জেলে থাকার কারণে নাঈম তার বৃদ্ধ বাবা-মা কাউকেই শেষ সময়ে জীবিত দেখে যেতে পারেননি। পরিবার ও স্থানীয় সমর্থকদের অভিযোগ— এই মামলায় কোনো নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বা গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছিল না।

তদন্ত পর্যায়ে রিমান্ডে নিয়ে অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তার কাছ থেকে জোরপূর্বক একটি তথাকথিত ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ আদায় করা হয়েছিল, যার ওপর ভিত্তি করেই এই রায় দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা খালাস পেলেও, কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় না থাকায় এবং হাফেজ ও আলেম হওয়ার কারণে নাঈমের বিরুদ্ধে ফাঁসি দেওয়া হলো বলে দাবি তার পরিবারের।

নাঈমের বড় ভাই এই রায়ের বিরুদ্ধে অবিলম্বে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন।

# ২২ বছর আগে যা ঘটেছিল দিরাইয়ের সেই সমাবেশে–

মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ জুন সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন শীর্ষ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সমাবেশ চলাকালে আকস্মিক ভয়াবহ এক গ্রেনেড হামলায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সভাস্থল। ওই হামলায় যুবলীগের এক কর্মী নিহত হন এবং অন্তত ২৯ জন গুরুতর আহত হন। তবে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।

ঘটনার পর দিরাই থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) হেলাল উদ্দিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২০ সালে লুৎফুজ্জামান বাবর, আরিফুল হক চৌধুরীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে এই মামলার বিচার শুরু হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সংবাদ

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই : মির্জা ফখরুল

Babul DRU

পুলিশের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চলছে, অ্যাসোসিয়েশনের নিন্দা

Babul DRU

এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা বৃহস্পতিবার

Babul DRU