ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার ব্যবহারের বিধান থাকছে না। একই সাথে বাতিল হচ্ছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এবং অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের বর্তমান ব্যবস্থা। সম্পূর্ণ নির্দলীয় ও কাগজের ব্যালটে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিমালায় ব্যাপক সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি জানান, আগামী জুন মাসের মধ্যেই এই সংশোধিত বিধিমালা চূড়ান্ত হবে এবং সব কিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের অক্টোবর মাস থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে পারবে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার জানান, নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে বিধিমালায় বেশ কিছু যুগান্তকারী ও কঠোর পরিবর্তন আনা হচ্ছে:
পোস্টার ও প্রতীকহীন নির্বাচন: জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কোনো পোস্টার থাকবে না। এছাড়া নির্বাচন সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে বিধায় প্রার্থীরা কোনো দলীয় প্রতীক ব্যবহার করতে পারবেন না।
স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা বাতিল: বর্তমানে নির্দলীয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দেওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, তা বাতিল করা হচ্ছে।
জামানত বৃদ্ধি: উপজেলা নির্বাচন বাদে স্থানীয় সরকারের অন্যান্য সব স্তরের নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানো হবে, তবে তা কী পরিমাণ বাড়বে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
মামলা ও অপরাধীদের বিষয়ে কঠোরতা: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসী ভোট বা পোস্টাল ভোটের কোনো সুযোগ থাকবে না। একই সাথে কোনো ফেরারি আসামি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের মামলায় যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, তারা নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিতে পারবেন না।
জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, ঈদের পরপরই সংশোধিত এই বিধিমালা চূড়ান্ত করা হবে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। জুনের মধ্যে পুরো বিধি প্রণয়নের কাজ শেষ করে অক্টোবরের দিকে মাঠপর্যায়ে নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।
সহিংসতাহীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন এই নির্বাচন কমিশনার:
১. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি; সরকারকে অবশ্যই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।
২. রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ; নির্বাচনে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু কোনো মারামারি বা সংঘর্ষ নয়।
৩. নির্বাচন কমিশনের আপসহীন মনোভাব; নিজস্ব বাহ্যিক শক্তি না থাকলেও কমিশনকে নীতি ও দৃঢ়তার জায়গা থেকে কঠোর বা ‘হুংকার’ দেওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে।
৪. নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সততা; প্রিসাইডিং অফিসার ও নির্বাচনী স্টাফদের আন্তরিকতা ও সততার ওপর জাল ভোট রোধ করা নির্ভর করে।
সাক্ষাৎকারে সহিংসতা রোধ প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কেউ সংঘর্ষ তৈরি করলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তি হবে। তবে শুধু আইনের কঠোর প্রয়োগ দিয়ে শান্তি আনা সম্ভব নয়, খেলোয়াড়রা যদি সারাদিন ফাউল করতেই থাকে, তবে রেফারি একা কয়টা ফাউল ধরবেন? তাই রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থাকা জরুরি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক জোটগুলো আচরণবিধি মেনে চলায় সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বা ভেজাল ধরা পড়লে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে ভোটকেন্দ্র বন্ধ করার মতো কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতেও দ্বিধা করবে না কমিশন।