বিশ্ব রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য যখন দ্রুত বদলাচ্ছে, সেই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ এখন ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ১১ দেশের বৈশ্বিক জোট ‘ব্রিকস’, যা বর্তমানে একটি বড় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।প্রতি বছর এ জোটের প্রধান সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যাকে বিশ্বের অন্যতম কূটনৈতিক সহাসম্মেলন বলা হয়ে থাকে।
চলতি বছর ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া প্রতিবেশী দেশ ভারতের নয়াদিল্লীতে। আমন্ত্রন পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। তার যোগ দেওয়া বা না দেওয়া নিয়ে বিশেষ আলোচনা তৈরি হয়েছে।
কি নিয়ে এই আলোচনা? তিনি যোগ দিলে কী বাংলাদেশের সামনে উন্মুক্ত হবে বিশ্বঅর্থনৈতিক ও কূনৈতিক অবারিত সুযোগ? না কি ওই সম্মেলনে না গেলে বন্ধ হয়ে যাবে বিশ্বদুয়ার? বাংলাদেশ কি ব্রিকসের সদস্য? নাকি সদস্য হতে চাচ্ছে?
এমন শত প্রশ্ন আর হিসাব নিকাশের মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে তারেক রহমানের নাম। বলা হচ্ছে- ব্রিকসের সদস্যপদ নয়; বরং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে কোন পরিচয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং বাংলাদেশ সেটিকে কোন দৃষ্টিতে দেখছে- জ্বলন্ত প্রশ্ন এখন সেটাই।
ব্রিকস কী?
ব্রিকস হলো উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর আন্তঃসরকারি সহযোগিতা কাঠামো। ‘ব্রিক’ নামটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে বোঝাতে। ২০০১ সালে অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল উদীয়মান অর্থনীতির সম্ভাবনা তুলে ধরতে ‘ব্রিক’ ধারণাটি সামনে আনেন। পরে ২০০৯ সালে চার দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলে এবং ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হলে নাম হয় ব্রিকস।
পরবর্তী সময়ে জোটের পরিধি আরও বাড়ে। বর্তমানে এর ১১ সদস্য। দেশগুলো হচ্ছে- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া। যা এখন বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্বকারী একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। বড় লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কারের দাবি জোরালো করা এবং বাণিজ্য, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও উন্নয়নে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা।
যদিও ব্রিকসের আলোচনায় আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, বিকল্প অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা, আন্তঃসীমান্ত লেনদেন এবং উন্নয়ন অর্থায়নের মতো বিষয় গুরুত্ব পেলেও এটি যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমাবিরোধী কোনো বিকল্প জোট নয়। কেননা- ব্রিকসের প্রধান লক্ষ্যের মধ্যে পরাশক্তি দেশগুলোকে যুক্ত করে বিশ্বে এ জোটের প্রভাব আরও বৃদ্ধির বিষয়টিও রয়েছে।
ভারত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতি ভারত। তাই এ বছর ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ভারতে হচ্ছে। ১১ সদস্য দেশের নেতাদের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন আমন্ত্রিত দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের উপস্থিতি সম্মেলনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে।
বিশেষ করে শি জিনপিংয়ের ভারত সফর এবং নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, নয়াদিল্লির সম্মেলনটি শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার বৈঠক নয়, বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ। চীন-ভারত সম্পর্ক, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গে এটি যুক্ত।
তারেক রহমানকে ঘিরে কেন আলোচনা?
বাংলাদেশ এই মুহূর্তে ব্রিকসের সদস্য নয়। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার প্রশ্নটি মূলত এসেছে আউটরিচ সেশন থেকে।
ভারত জানিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট করেছিলেন যে, তারেক রহমানকে একই সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের জন্যও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ব্রিকসের আমন্ত্রণটি ছিল বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবে আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার জন্য।
এখানেই শুরু হয় কূটনৈতিক বিতর্ক। কারণ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য একটি আলাদা দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণ আগেই পেয়েছিলেন ভারতের তরফ থেকে। আর ব্রিকসের আমন্ত্রণ বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ার। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে দুই বছরের জন্য এই আঞ্চলিক জোটের সভাপতি বাংলাদেশ, যার অপর সদস্য ভারত, ভুটান, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড।
অর্থাৎ ভারতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে ব্রিকস আউটরিচে আমন্ত্রণ জানানোর একটি কূটনৈতিক ভিত্তি ছিল। কিন্তু ঢাকার কাছে প্রশ্নটি দাঁড়ায়—প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম ভারত সফর কি বহুপক্ষীয় কোনো অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হবে, নাকি সেটি হবে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফর?
যদিও ইতোমধ্যেই তা স্পষ্ট করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। ১০ সেপ্টেম্বর তিনি বলেছেন, তারেক রহমানকে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, তাই যাচ্ছেন না। এমনকি এই আমন্ত্রণের ভিত্তিতে বাংলাদেশ থেকে কোনো প্রতিনিধি পাঠানোরও সুযোগ নেই।
শেষ কথা
২০ বছর আগে চারটি উদীয়মান অর্থনীতির সহযোগিতা থেকে শুরু হওয়া ব্রিকস আজ বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এর সদস্য দেশগুলো এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি, বাণিজ্য ও কূটনীতিতে বড় প্রভাব রাখে।
আর ২০২৬ সালের নয়াদিল্লি সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে অন্য একটি কারণে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে ভারত-বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ।
সূত্র: ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ব্রিকস ২০২৬ ওয়েবসাইট, রয়টার্স, এপি