হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ছেই। গত ২৬ আগস্টের ওই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে অন্তত ৮০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজারের বেশি মানুষ। দুর্যোগ আঘাত হানার আগে মানুষ পাঁচ মিনিটেরও সতর্কবার্তা পায়নি বলে জানা গেছে। উদ্ধার অভিযান ও ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলার মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে—এত বড় দুর্যোগের আগে কি আরও কার্যকর সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব ছিল?
হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল যখন ভয়াবহ এই দুর্যোগের ধাক্কা সামলাতে ব্যস্ত, তখনই সামনে এসেছে দেশটির সঙ্গে চীনের দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার অভিযোগ। নেপালি কর্মকর্তাদের দাবি, হিমবাহ ও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সময়মতো পাওয়া যায়নি।
দুর্যোগের প্রায় এক মাস আগে বন্যা, আবহাওয়া ও হিমবাহ-সম্পর্কিত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং তা মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়াতে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে বৈঠক করেছিলেন চীন ও নেপালের কর্মকর্তারা। তবে বৈঠকের পরও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন নেপালি কর্মকর্তারা।
নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের জলসম্পদবিদ সৌহার্দ্র যোশি বলেন, ‘আমরা তাদের কাছ থেকে আসলে যা চেয়েছিলাম এবং এখনো চাইছি, তা হলো- ওই এলাকায় হিমবাহের কোনো অস্বাভাবিক নড়াচড়া বা পরিবর্তন শুরু হলে যেন আমরা কিছুটা আগেই জানতে পারি।’
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী ধরম রাজ উপ্রেতি ব্লুমবার্গকে বলেন, দুর্যোগ আঘাত হানার আগে মানুষ পাঁচ মিনিটেরও সতর্কবার্তা পায়নি। তিনি বলেন, ‘উচ্চ পার্বত্য এলাকায় আমাদের আবহাওয়া স্টেশন নেই। সীমান্তপারের তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকাই এর অন্যতম কারণ।’ জাতীয় সীমান্তের মধ্যে আবহাওয়া ও জলবায়ুসংক্রান্ত তথ্যের আদান-প্রদানও সীমিত বলে জানান তিনি।
বাংলাভিশনের গুগল নিউজ ফলো করতে ক্লিক করুন
গত বছরও একই ধরনের উদ্বেগ চীনা কর্মকর্তাদের জানিয়েছিল নেপাল। সে সময় চীনের তিব্বত অঞ্চলে একটি সুপ্রাগ্লেশিয়াল হ্রদের পানি উপচে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হলে দুই দেশে নয়জন নিহত এবং এক ডজনের বেশি মানুষ নিখোঁজ হন। ওই ঘটনার পর সীমান্তপারের দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন নেপালি কর্মকর্তারা।
তবে চীন দাবি করছে, নেপালকে প্রয়োজনীয় সব তথ্য সময়মতো জানানো হয়েছিল। নেপালে অবস্থিত চীনা দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
দূতাবাসের দাবি, মে মাসের বৈঠকে সীমান্তপারের দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান জোরদারে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে। বিদ্যমান প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চীন হিমবাহ ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নেপালের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছে। হিমালয় অঞ্চলে পর্যবেক্ষণকাজে বিশেষজ্ঞদের নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হলেও তথ্য সময়মতোই ভাগাভাগি করা হয়েছে বলে দাবি করেছে চীনা দূতাবাস।
ভয়াবহ বন্যার পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তিব্বত মালভূমিজুড়ে হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদগুলোর জরিপ দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টিও দুর্যোগের আগাম ঝুঁকি শনাক্তের সক্ষমতা বাড়াতে আরও শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট একটি হিমবাহ ধসে ভয়াবহ এই আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়। বরফ, কাদা, পাথর ও দ্রুতগতির পানির বিশাল স্রোত নেপালের একটি উপত্যকার ওপর দিয়ে নেমে আসে। পথে থাকা পুরো বসতি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়।
সোমবার (৩১ আগস্ট) পর্যন্ত নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে এ দুর্যোগে অন্তত ৮০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজারের বেশি মানুষ। দুর্গম এলাকায় এখনো উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস