মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়ে আমেরিকার সাথে চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত ঘোষণা করেছে ইরান। লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই আরও জোরদার করতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই তেহরান এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়।
সোমবার ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ব্যারেল প্রতি ৫ ডলারেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
তাসনিম নিউজের তথ্য অনুযায়ী, লেবাননে ইসরাইলি হামলার জেরে ক্ষুব্ধ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যস্থতাকারী দল ওয়াশিংটনের সাথে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। গত এপ্রিলের শুরু থেকে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মাঝেই গত সপ্তাহে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে নতুন করে মারাত্মক সামরিক সংঘাত শুরু হয়।

এর ওপর লেবানন ফ্রন্টে ইসরাইলের নতুন আগ্রাসন তিন মাস ধরে চলা এই যুদ্ধকে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যম এক্সে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, যে কোনো একটি ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন মানে সব ফ্রন্টেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করা। এই আগ্রাসনের সমস্ত পরিণতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই দায়ী থাকবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিতভাবে শুরু করা এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ইরান ইতিপূর্বেই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
তাসনিম জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরান ও তাদের সহযোগী ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ এবার হরমুজ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করার এজেন্ডা হাতে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, ইসরাইল ও তার সমর্থকদের শাস্তি দিতে সুয়েজ খালের নৌপথ নিয়ন্ত্রণকারী ইয়েমেন উপকূলের কৌশলগত ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালীতেও নতুন ফ্রন্ট খোলার পরিকল্পনা করছে তারা। ইয়েমেনের হুথিরা এই ফ্রন্ট সক্রিয় করলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার জেরে গত সপ্তাহে দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বিমান হামলার পর, সোমবার কুয়েতে অবস্থিত একটি প্রধান মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরানের আইআরজিসি।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা কুয়েতে মোতায়েন করা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ছড়া দুটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশেই ধ্বংস করেছে এবং এতে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি। তবে এই হামলার পর কুয়েত তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে এই ধরণের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেও গভীর রাতে এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর আগের দাবিতেই অনড় থেকে বলেন, ইরান আসলে একটি চুক্তি করতে খুবই আগ্রহী। একই সাথে তিনি রিপাবলিকান পার্টির ভেতরের ও বাইরের সমালোচকদের এই আলোচনা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য বা ‘কিচিরমিচির’ করা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা শুধু শান্ত হয়ে বসে থাকুন, শেষ পর্যন্ত সব ঠিক হয়ে যাবে, সব সময়ই যেমনটা হয়ে থাকে!
তবে ট্রাম্পের এই আশাবাদকে উড়িয়ে দিয়ে সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী ও স্ববিরোধী বার্তা পাঠানোর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, আমেরিকা ক্রমাগত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে এবং নিত্যনতুন স্ববিরোধী দাবি সামনে আনছে, যা আলোচনার প্রক্রিয়াকে কেবল দীর্ঘায়িতই করবে। বাঘাই পরিষ্কার করে দেন, মধ্যপ্রাচ্যে এবং বিশেষ করে লেবাননে ইসরাইলের পদক্ষেপকে আমেরিকা থেকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।