দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার আসনে থাকা আলী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক ইসরাইলি হামলায় নিহত হওয়ার পর তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দে এক বিশাল শূন্যতা ও পটপরিবর্তন তৈরি হয়। তাঁর পর স্থলাভিষিক্ত হন ৫৬ বছর বয়সী ধর্মীয় নেতা ও তাঁর পুত্র মোজতবা খামেনি।
তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোজতবা খামেনি তাঁর পিতার মতো একক ও একচ্ছত্র প্রভাব খাটানো বা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারছেন না। এর পরিবর্তে ইরানের পর্দার আড়ালে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বর্তমান ও সাবেক শীর্ষ কমান্ডারদের নিয়ে গঠিত একটি ছোট ও অভিজাত গোষ্ঠী। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা দাবি করছেন যে, সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মোজতবা খামেনি নিজেই পরিচালনা করছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি এখন আর কোনো একক ব্যক্তির হাতে সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষমতার কেন্দ্রে এখন রয়েছে একটি কট্টরপন্থী ‘ব্যান্ড অব ব্রাদার্স’ বা ভ্রাতৃত্বের বন্ধন।

এই সামরিক নেতাদের প্রধান অভিন্ন অভিজ্ঞতা হলো ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক আট বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব ও তার নেতাকে রক্ষার জন্য গঠিত এই গার্ড কর্পসের অনেক কমান্ডার যখন জেনারেল পদে পদোন্নতি পান, তখন তাঁদের বয়স ছিল মাত্র ২০ থেকে ৩০ বছরের কোঠায়।
সেই যুদ্ধে ইরাকের প্রতি পশ্চিমাদের অন্ধ সমর্থন তেহরানকে এই শিক্ষা দিয়েছিল যে, যে কোনো মূল্যেই হোক ইরানকে নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হবে। যুদ্ধ শেষে এই অভিজ্ঞ কমান্ডাররাই দেশের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেন।
বর্তমানে মোজতবা খামেনেইর দীর্ঘদিনের চেনা এবং তাঁর পিতার কার্যালয় পরিচালনার সূত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকা এই কট্টরপন্থী নেতারাই মূলত ইরান চালাচ্ছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, এই ব্যক্তিরা দেশের সবচেয়ে কট্টরপন্থী ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্ত, যারা শুধু ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ টিকিয়ে রাখতেই বদ্ধপরিকর নন, বরং সরকারি দমনপীড়ন চালাতে এবং ভিন্নমত দমনে কঠোর ও নৃশংস পদ্ধতির জন্য পরিচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁদের এই অভিন্ন অতীত, কর্মজীবন এবং আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, সরকারের বিপর্যয় কিংবা প্রায় ৫০ জন শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতার গুপ্তহত্যার পরও তেহরানের শাসনব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে পড়েনি।
চ্যাটানুগার টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং গার্ড বিশেষজ্ঞ সাঈদ গোলকার নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, এই নেতারা কীভাবে কাজ করেন এবং ক্ষমতা ভাগাভাগি করেন তা এখনো অনেকটাই অস্পষ্ট। হামলার ভয়ে অনেকেই এখন জনসমক্ষ থেকে দূরে অন্তরালে চলে গেছেন।
তবে তাঁরা একত্রিত হয়ে ‘দেশ পরিচালনাকারী এক শক্তিশালী ভ্রাতৃত্ব’ গঠন করেছেন। তাঁদের কাছে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা, বিরোধী দল, সংস্কারপন্থী ও কট্টরপন্থীদের ব্যাপারে সব ধরনের গোপন তথ্য ও গোয়েন্দা রিপোর্ট রয়েছে। এই গোয়েন্দা আধিপত্যের কারণেই তাঁরা ধীরে ধীরে ইরানের রাজনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন।

ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ: ইরানের পার্লামেন্টের ৬৪ বছর বয়সী এই স্পিকার এর আগে গার্ডসের বিমান বাহিনী প্রধান, জাতীয় পুলিশ প্রধান এবং তেহরানের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ১৯৯৯ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় সাধারণ মিলিশিয়াদের মতো মোটরসাইকেলে চড়ে লাঠি দিয়ে বিক্ষোভকারীদের পেটানোর কথা তিনি নিজেই এক সময় গর্ব করে বলেছিলেন। বর্তমানে তিনি দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অভিজাতদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। অনেক সমালোচকের ধারণা, তিনি এমন একটি শান্তি চুক্তি করতে চান, যা তাঁকে ইরানের ভবিষ্যৎ একনায়ক বা শক্তিশালী নেতায় পরিণত করবে।

মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর: সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক শ্রেণিতে রূপান্তরে এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ ৭২ বছর বয়সী এই কট্টরপন্থী নেতা। তিনি গার্ডসের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র উপমন্ত্রী ছিলেন। গত মার্চ মাসে ইসরাইলি হামলায় আলী লারিজানি নিহত হওয়ার পর জোলঘাদরকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব পদে নিয়োগ দেয়া হয়। নতুন এই পদে থেকে তিনি নিশ্চিত করছেন যাতে সরকারের রাজনৈতিক, সামরিক, নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগীয় সব শাখা একসঙ্গে একযোগে কাজ করে।

আহমদ ওয়াহিদি: ৬৭ বছর বয়সী এই সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা গত মার্চ মাসে মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় তাঁর পূর্বসূরি নিহত হওয়ার পর আইআরজিসির শীর্ষ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি এর আগে ইরানের প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৮ সালে তিনি কুদস ফোর্সের প্রথম কমান্ডার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, যা লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক প্রক্সি মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তুলেছিল। তাঁর আমলে ১৯৯৪ সালে বুয়েনস আয়ার্সে একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলা এবং ১৯৯৬ সালে সৌদি আরবের ধাহরানে মার্কিন বিমান বাহিনীর ব্যারাকে ট্রাক বোমা হামলার মতো ঘটনা ঘটে, যদিও ইরান সবসময়ই এসব হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে।

মোহাম্মদ আলী জাফারি: ৬৮ বছর বয়সী এই টু-স্টার জেনারেল সাবেক সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন। বর্তমানে কোনো অফিশিয়াল পদে না থাকলেও ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি দীর্ঘ সময় গার্ডসের প্রধান কমান্ডার ছিলেন। ‘আজিজ’ নামে পরিচিত জাফারিকে বিকেন্দ্রীকৃত কমান্ডের ‘মোজাইক স্ট্র্যাটেজি’ বা কৌশল গড়ে তোলার কৃতিত্ব দেওয়া হয়, যার কারণে বর্তমান যুদ্ধে অনেক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হওয়ার পরও এই বাহিনী লড়াই চালিয়ে যেতে পারছে। ইসরায়েলের মুখোমুখি হওয়া আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীগুলো তৈরিতেও তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

গোলাম-হোসেন মহসেনী-এজেই: ৬৯ বছর বয়সী এজেই ২০২১ সাল থেকে ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ভিন্নমত দমনে আদালতকে ব্যবহার করার কারণে তাঁর কুখ্যাতি রয়েছে এবং চলতি বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর একের পর এক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কারণে তাঁকে ‘জল্লাদ বিচারক’ বা ‘হ্যাংগিং জাজ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়েরই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন।

হোসেন তায়েব: ৬৩ বছর বয়সী এই শিয়া মুসলিম ধর্মযাজক এক সময় ইরানের কুখ্যাত বাসিজ মিলিশিয়া এবং সরকারের কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স অপারেশন পরিচালনা করতেন। এরপর ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি গার্ডসের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ছিলেন। ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে আঘাত হানার পর সৃষ্ট কোন্দলে ২০২২ সালে তিনি শীর্ষ গোয়েন্দা পদ হারালেও এখনো ক্ষমতার কেন্দ্রে সমান প্রভাবশালী। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় গার্ডসের মর্যাদাপূর্ণ ‘হাবিব ব্যাটালিয়ন’-এ একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে তিনি মোজতবা খামেনেইর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে বিশ্বাস করা হয়।