আন্তর্জাতিক

পেন্টাগনের ইমেইল ফাঁস ইরান নিয়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে বড় ফাটল

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলোর সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়তে থাকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে। এ হামলায় ইউরোপের কোনো মিত্রকে পাশে পায়নি ওয়াশিংটন। তখন থেকেই যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালিসহ ইউরোপের ‘এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র’দের কঠোর সমালোচনা শুরু করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধে পাশে না থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের এসব দেশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বিবেচনা করছে।

প্রকাশ হওয়া মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক ইমেইলে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ওই ইমেইলের বরাত দিয়ে গতকাল শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর সমালোচক স্পেনকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো থেকে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

এটা করা হচ্ছে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তাদের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে। এর প্রেক্ষাপটে ন্যাটো জানিয়েছে, এ সামরিক জোট থেকে সদস্য দেশগুলোকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত বা বহিষ্কারের কোনো বিধান নেই।

ন্যাটোর একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা চুক্তিতে ‘ন্যাটোর সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কারের কোনো বিধানের কথা বলা নেই।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেন, পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ ইমেইলে এমন পদক্ষেপের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে তার অভিযানে সমর্থন দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা মিত্রদের শাস্তি দিতে পারবে।
ইমেইলে থাকা ন্যাটো থেকে স্পেনকে বাদ দেওয়ার পরামর্শের বিষয়টি সম্পর্কে কথা বলেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা ইমেইলের ভিত্তিতে কাজ করি না। আমরা সরকারি নথি ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের গৃহীত সরকারি অবস্থানের ভিত্তিতে কাজ করি।’

ইমেইলটিতে যুক্তরাজ্যের প্রসঙ্গও এসেছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে নজিরবিহীনভাবে যুক্তরাজ্যও পাশে থাকেনি ট্রাম্প প্রশাসনের। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁকে কোনো চাপ দিয়েই যুদ্ধে জড়ানো যাবে না; তিনি ব্রিটিশ জনগণকে নিয়ে ভাবেন। ইমেইলে দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পর্যালোচনারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনাও তাদের দাবি জানিয়ে আসছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গতকাল প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব ‘যুক্তরাজ্যের হাতেই ন্যস্ত’। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় যুক্তরাজ্যের একটি বৈদেশিক অঞ্চল হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছে। আমরা সবসময় দ্বীপবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও সার্বভৌমত্ব যে যুক্তরাজ্যের হাতেই ন্যস্ত, সেই সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছি।’

ওই মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাজ্যের অবস্থান স্পষ্ট এবং দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব যুক্তরাজ্যের হাতেই ন্যস্ত; দ্বীপবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এ অবস্থানটি আগেও ধারাবাহিকভাবে মার্কিন প্রশাসনগুলোর কাছে স্পষ্টভাবে জানিয়ে এসেছি; কোনো কিছুই তা পরিবর্তন করতে পারবে না।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। হামলার পর ও পরবর্তীতে ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তখন ন্যাটোর মিত্রদের বৃহত্তর ভূমিকা পালনে অনীহার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার তাদের সমালোচনা করেন। ইরানের ওপর হামলার জন্য নিজেদের ভূখণ্ডে বিমান ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় স্পেন। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে– রোটা নৌঘাঁটি ও মোরোন বিমান ঘাঁটি।

এর আগে গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেবেন– প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন ঘোষণার পর ইউরোপের দেশগুলো কড়া ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল; ইউরোপের সঙ্গে এর বাসিন্দাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন আরাঘচি, এগোতে পারে শান্তি আলোচনা
আলজাজিরা জানিয়েছে, যুদ্ধ অবসানে নতুন করে আলোচনা শুরুর আশা জাগিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। গতকাল শুক্রবার রাতে ছোট একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে তাঁর ইসলামাবাদ সফর শুরু করার কথা। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনা ফের শুরুর গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ এটি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, ‘এ সফরের উদ্দেশ্য হলো– দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করা এবং এ অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসনের দ্বারা ইরানের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা।’ এর আগে আরাঘচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। ইসলামাবাদ সফর শেষে তিনি রাশিয়ার মস্কো ও ওমানের মাস্কাট সফর করবেন।
সিএনএন জানিয়েছে, আলোচনায় অংশ নিতে পাকিস্তানে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাও। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কেরোলিন লিভিট জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তাঁর জামাতা জেরাড কুশনার আলোচনায় অংশ নিতে আজ শনিবার ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওয়ানা করবেন। ফক্স নিউজকে তিনি জানান, দুই পক্ষ সরাসরি আলোচনায় অংশ নেবে।

জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে 
বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত জ্বালারি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, গতকাল সকালে ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ১০৭ দশমিক ৪৮ ডলার পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে, যা ৭ এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। ওই দিনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
প্রণালিটি এখনও মূলত অবরুদ্ধ থাকায় এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ অঞ্চলে তেল উৎপাদন অর্ধেকেরও বেশি কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে দাম কমছে না। ফরেক্স ডটকমের বাজার বিশ্লেষক ফাওয়াদ রাজাকজাদা ব্যাখ্যা করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ায় তেলের দামের ঝুঁকি ঊর্ধ্বমুখীই রয়েছে। তিনি বলেন, এ সপ্তাহে তেলের দাম দৃঢ়ভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে, যা স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরিকল্পিত আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জেরে ঘটেছে।’

মধ্যপ্রাচ্যে ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ বিমানবাহী রণতরী
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। ফলে এ অঞ্চলে কর্মরত বিশাল মার্কিন যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বেড়ে তিনটিতে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দায়িত্বে থাকা সামরিক কমান্ড এক্সে এক পোস্টে জানায়, রণতরীটি ২৩ এপ্রিল, ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের দায়িত্বাধীন এলাকায় ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছিল। পোস্টটিতে যুদ্ধবিমানে ঠাসা ডেকসহ জাহাজটির একটি ছবিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সাম্প্রতিক সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা নেই: ইরান

Newsdesk

ইরান যুদ্ধে খরচ ৩৫ বিলিয়ন ডলার, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ তলানিতে

Newsdesk

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে টোল আদায় শুরু করলো ইরান

Newsdesk