লাখো মুসলিম হাজির ‘লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’ ধ্বনিতে মুখরিত পবিত্র মিনার জামারাত প্রাঙ্গণ। আজ বুধবার পবিত্র ঈদুল আজহার প্রথম দিনে উষালগ্নে মিনায় শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করার মধ্য দিয়ে হাজিরা হজের অন্যতম প্রধান একটি ওয়াজিব হুকুম সম্পন্ন করেছেন।
সৌদি আরবের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশী ও বিদেশী মিলিয়ে এবার মোট ১৭ লাখ ৭ হাজার ২০১ জন ধর্মপ্রাণ মুসলমান পবিত্র হজ পালন করছেন। যার মধ্যে ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৬৫৫ জন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন এবং ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৪৬ জন সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নাগরিক ও বাসিন্দা। সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে।
পবিত্র হজের ধারাবাহিক নিয়ম অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার হজের মূল স্তম্ভ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের পর সূর্যাস্তের পর হাজিরা মিনা ও আরাফাতের মধ্যবর্তী খোলা প্রাঙ্গণ মুজদালিফার দিকে রওনা হন। সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, হাজিরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে মুজদালিফায় পৌঁছান এবং সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে (কসর) আদায় করেন।
এরপর রাতের বেলা মুজদালিফার খোলা প্রান্তরে অবস্থান করে শয়তানকে নিক্ষেপের জন্য ছোট ছোট পাথর বা কঙ্কর সংগ্রহ করেন হাজিরা। সেখানে রাত্রিযাপন শেষে আজ ফজরের নামাজ আদায় করেই আল্লাহর মেহমানরা মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং প্রথম দিন বড় শয়তানের প্রতীক ‘জামারাতুল আকাবা’য় একে একে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করেন।
ইসলামী শরিয়ত ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই পাথর নিক্ষেপের আচারটি মূলত ইসলামের খলিল হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক ত্যাগের স্মৃতি বহন করে। মহান আল্লাহর আদেশে যখন তিনি নিজের পুত্রকে কোরবানি দিতে যাচ্ছিলেন, তখন মিনার এই স্থানেই শয়তান তাঁকে আল্লাহর হুকুম অমান্য করার জন্য প্ররোচিত করতে কুপ্রস্তাব দিয়েছিল। সেই সময় শয়তানকে প্রতিহত করতে হজরত ইব্রাহিম (আ.) পাথর ছুড়ে মেরেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে হজের অংশ হিসেবে মিনায় তিনটি বড় পাথরের স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে হাজিরা প্রতি বছর পাথর নিক্ষেপ করেন।
সৌদি প্রেস এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবার জামারাত কমপ্লেক্সের বহুতল বিশিষ্ট আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং সুনির্দিষ্ট প্রবেশ ও বহির্গমন পথের কারণে কোনো ধরনের হুড়োহুড়ি বা অতিরিক্ত ভিড় ছাড়াই হাজিরা অত্যন্ত নিরাপদে পাথর নিক্ষেপ সম্পন্ন করেছেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনী, মেডিকেল টিম, সিভিল ডিফেন্স এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়োজিত ছিলেন।

পাথর নিক্ষেপের এই প্রথম ধাপ শেষ করার পর হাজিরা ঈদুল আজহা বা ‘ইয়াওমুন নাহর’ (কোরবানির দিন)-এর বাকি আনুষ্ঠানিকতাগুলো সম্পন্ন করতে শুরু করেন। এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি (হাদি) দেওয়া, যা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পুত্র কোরবানির মহান ইচ্ছার স্মরণে করা হয়।
এরপর পুরুষ হাজিরা মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করার মাধ্যমে এবং নারী হাজিরা চুলের অগ্রভাগ কাটার মাধ্যমে ‘ইহরাম’ ভাঙেন (আংশিক হালাল হন)। এরপর হাজিরা মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে গিয়ে হজের অন্যতম প্রধান ফরজ কাজ ‘তাওয়াফে জিয়ারাহ’ (কাবা শরিফ সাতবার প্রদক্ষিণ) সম্পন্ন করবেন এবং পুনরায় মিনায় ফিরে আসবেন।
আগামী দিনগুলোতে, যা ‘আইয়ামে তাশরিক’ নামে পরিচিত, হাজিরা প্রতিদিন মিনায় অবস্থিত তিনটি জামারাতের (ছোট, মেজো ও বড় শয়তান) প্রতিটিতেই সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করবেন। সবশেষে মক্কা ত্যাগের আগে বিদায়ী তাওয়াফ বা ‘তাওয়াফুল বিদা’ সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে শেষ হবে পবিত্র হজের এই মহিমান্বিত যাত্রা।