আন্তর্জাতিক

যুদ্ধবিরতি ও পরমাণু আলোচনার দোরগোড়ায় আমেরিকা-ইরান

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও পারস্য উপসাগরজুড়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতা কাটিয়ে অবশেষে পর্দার আড়ালে জোরদার হয়েছে কূটনৈতিক তৎপরতা। দুই দেশের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি রক্ষা এবং একটি টেকসই সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির আভাস পাওয়া গেছে, যা দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ সুগম করতে পারে।

তবে চুক্তির সময়সীমা এবং এর পরিধি নিয়ে এখনও কিছু জটিলতা রয়ে গেছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা বাড়াচ্ছে। চলমান এই নেপথ্য কূটনীতির সর্বশেষ পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:

Iran Air Defence 06
আমেরিকা ও ইরান পরিস্থিতি:  
আমেরিকা ও ইরান তাদের বর্তমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়াতে এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনায় বসতে একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। আল জাজিরাকে দেয়া মার্কিন সূত্রের তথ্যমতে, প্রস্তাবিত এই রূপরেখায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উন্মুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। শর্তানুযায়ী, ইরানকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সমুদ্র থেকে সব মাইন অপসারণ করতে হবে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে আমেরিকাও তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও এই চুক্তিতে চূড়ান্ত স্বাক্ষর করেননি।

সাম্প্রতিক সামুদ্রিক তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরান-বহির্ভূত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, তীব্র উত্তেজনা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং নরওয়ের পতাকাবাহী জাহাজগুলো এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে পুনরায় যাতায়াত শুরু করেছে।

কূটনীতিতে অগ্রগতির লক্ষণ থাকলেও ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যকার মতবিরোধ এখনও কাটেনি। এটি আলোচনার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গেছে।

JD Vence
ইরান ফুটবল দলের ভিসা অনিশ্চয়তা:
 আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার জন্য ইরানি দল এখনও আমেরিকার ভিসার অপেক্ষায় রয়েছে। মেক্সিকোতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, তাঁর দেশের দল ‘সমান সুযোগ’ পাচ্ছে না।

এর আগে অ্যারিজোনায় ক্যাম্প করার পরিকল্পনা থাকলেও ভিসা জটিলতায় তা বাতিল করে মেক্সিকোর টিজুয়ানাতে নিজেদের প্রস্তুতি ক্যাম্প স্থানান্তর করেছে ইরান দল। আগামী ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে ইরানের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে গ্রুপ পর্বে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম ও মিসর।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও ওয়াশিংটন সফর: পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যকার এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান। গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ওয়াশিংটন সফরে যাচ্ছেন। সেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে তাঁর বৈঠকে ইরান যুদ্ধের বিষয়টিই প্রধান এজেন্ডা হিসেবে থাকবে।

Gaza 01
উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিক্রিয়া: 
কুয়েত অভিমুখে ধেয়ে আসা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করার পর, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই ঘটনাকে ‘ইরানি আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কুয়েত তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রাখে বলে দুই দেশ পুনর্ব্যক্ত করেছে। তবে ইরান সরাসরি কুয়েতকে নিশানা করার কথা স্বীকার না করলেও দেশটির রেভল্যুশনারী গার্ডস জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ ইরানে সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার জবাবে আমেরিকার একটি সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছিল।

কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ফোনে আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাস এবং যুদ্ধবিরতি শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। কাতার বর্তমানে এই আঞ্চলিক শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে মধ্যস্থতা বজায় রাখছে।

ইরানের সামরিক খাত এবং আইআরজিসি’কে অর্থায়নে সহায়তার অভিযোগে বেশ কিছু কোম্পানি, ব্যক্তি এবং জাহাজের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ হংকং-ভিত্তিক কিছু সংস্থাকেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে, যারা ইরানের বিলিয়ন ডলারের তেল বিক্রির সাথে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

Benjamin Netanyahu
ইসরাইল, গাজা ও লেবানন পরিস্থিতি: 
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর সামরিক বাহিনীকে গাজা উপত্যকার আরও গভীরে নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন, যার লক্ষ্য ফিলিস্তিনি এই ভূখণ্ডের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দখল করা। গত অক্টোবর মাসে আমেরিকার মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ইসরাইলি বাহিনীকে একটি নির্দিষ্ট সীমানার পেছনে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হলেও, বর্তমানে তারা গাজার প্রায় ৬৪ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি গাজাকে সম্পূর্ণ নিজেদের অধীনে নেওয়া এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হতে পারে।

এদিকেহিজবুল্লাহর সাথে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও বৈরুত এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনী ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে। লেবানন কর্তৃপক্ষের মতে, নার ও শিশুসহ অন্তত ১৭ জন এই হামলায় নিহত হয়েছেন। আগামীতে আমেরিকা ও লেবানন-ইসরাইল সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে শান্তি বৈঠকের কথা থাকলেও, এই নতুন হামলা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

সাম্প্রতিক সংবাদ

পদত্যাগ করলেন যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী

Newsdesk

রাতের মধ্যেই ইরানের তেল ও খার্গ দ্বীপ দখলের হুমকি দিলেন ট্রাম্প

Newsdesk

মার্কিন হামলায় ২ ভারতীয় নাবিক নিহত, একজন নিখোঁজ

Newsdesk