পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে মঙ্গলবার ইসলামের অন্যতম পুণ্যভূমি আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ মুসলিম উম্মাহ। সৌদি আরবের তীব্র তাপদাহ ও প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করেই আল্লাহর মেহমানরা জিকির, ইবাদত ও কান্নাকাটি করে এক আধ্যাত্মিক আবহে দিনটি অতিবাহিত করছেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা।
জিলহজ মাসের নবম দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার ফজরের নামাজের পর থেকেই শুভ্র বসন বা ইহরাম পরিহিত হাজিরা দলে দলে আরাফাতের ময়দানে জড়ো হতে শুরু করেন। সকাল থেকেই পুরো ময়দান মুখরিত হয়ে ওঠে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে।
মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে হাজিরা আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন, জিকির-আজকার করছেন এবং পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতে মশগুল রয়েছেন।

ঐতিহাসিক এই আরাফাতের ময়দানেই মানবতার দূত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, ‘ওকুফে আরাফাহ’ বা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজের প্রধান ও অন্যতম ফরজ স্তম্ভ।
সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই পবিত্র স্থানের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে অবস্থানের পর হাজিরা মাগরিবের নামাজ না পড়েই মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা দেবেন। সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করবেন এবং মিনায় প্রতীকী শয়তানকে নিক্ষেপ করার জন্য প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করবেন।
এরপর বুধবার থেকে মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি ও মাথা মুণ্ডনসহ হজের পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতাগুলো শুরু হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান বিধ্বংসী যুদ্ধের কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে এই ভূরাজনৈতিক সংকট ও যুদ্ধকালীন বৈরি আবহাওয়াকে পেছনে ফেলে এবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১৫ লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমান হজ পালন করতে মক্কা নগরীতে সমবেত হয়েছেন।
যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইরানের কোটায়। এবার হজে অংশ নিতে ইরান থেকে এসেছেন ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ। যদিও শুরুতে এই সংখ্যা ৮৬ হাজার হওয়ার কথা ছিল। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ নিশ্চিত করেছে যে, ‘যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির’ কারণেই মূলত ইরান থেকে এবার হাজিদের আগমন আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে।
তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিরতার মধ্যেও গত ২০১৫ সালের তুলনায় এবার বিদেশ থেকে রেকর্ডসংখ্যক মানুষ হজ পালন করতে এসেছেন। ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম এই হজ শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জীবনে অন্তত একবার পালন করা ফরজ।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মক্কায় তাপমাত্রা রেকর্ড ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে ঠেকেছে। হজের অধিকাংশ আনুষ্ঠানিকতাই খোলা আকাশের নিচে সম্পন্ন করতে হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে পাঁচ থেকে ছয় দিন সময় লেগে যায়।
এই তীব্র গরমে হাজিরা যাতে কোনো ধরনের শারীরিক ঝুঁকিতে বা হিটস্ট্রোকের মুখে না পড়েন, সে জন্য সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও হজ কর্তৃপক্ষ হাজিদের সার্বক্ষণিক ছাতা ব্যবহার করার, বেশি বেশি পানি ও তরল খাবার পান করার এবং সরাসরি রোদ থেকে সুরক্ষিত থাকার বিশেষ পরামর্শ দিয়েছে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধের দীর্ঘশ্বাস আর প্রকৃতির চরম উত্তাপকে পাশে ঠেলে এক অপার্থিব শান্তির খোঁজে স্রষ্টার চরণে আকুল আবেদন জানিয়ে চলেছেন বিশ্ব মুসলিমের এই মহামিলন মেলা।