রোববার শততম দিনে পদার্পণ করল ইরান ভূখণ্ডে আমেরিকা ও ইসরাইলের চালানো যৌথ যুদ্ধ। কিন্তু শততম দিনের এই মাইলফলকে দাঁড়িয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের বারুদ কিংবা শান্তি আলোচনার কূটনীতি ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গণ-অসন্তোষ। মার্কিন জনগণের সিংহভাগের কাছে এই যুদ্ধ চরমভাবে একটি ‘অপ্রীতিকর ও অপ্রয়োজনীয়’ সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে; যা বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর রিপাবলিকান পার্টির জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই বিভিন্ন জনমত জরিপে স্পষ্ট ছিল, আমেরিকার সাধারণ মানুষ ইরানের ওপর বোমাবর্ষণের ঘোর বিরোধী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন আচমকা যুদ্ধ শুরু হলো, তখনও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের ‘ক্রিটিক্যাল ইস্যুজ পোল’-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৬ শতাংশ মার্কিন ভোটার মনে করেন যে এই যুদ্ধে আমেরিকা জিতছে বা জিতেছে।

অর্থাৎ, আমরাই জিতছি- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন ঘন ঘন জয়ের দাবিকে মার্কিন জনতা সোজা উড়িয়ে দিয়েছে। জরিপে আরও দেখা গেছে, স্বয়ং ৩৩ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থকসহ দেশের সিংহভাগ মানুষ মনে করেন, এই যুদ্ধ আমেরিকার জাতীয় স্বার্থে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করেছে। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের পিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের অধ্যাপক শিবলি তেলহামি এই ফলাফলকে বিস্ময়কর ও ট্রাম্পের জন্য এক বড় ধরণের সতর্কবার্তা বলে উল্লেখ করেছেন।
অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালী ও মার্কিনীদের পকেট কাটার ধুম: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে এক ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ শত শত বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে। এর জবাবে ইরানও তীব্র ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয়। ফলস্বরূপ, বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।

গত ৬ এপ্রিল একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও পারস্য উপসাগরে ছোটখাটো সংঘর্ষ থামেনি এবং ইরানের এই নৌ-অবরোধ বহাল রয়েছে। জবাবে আমেরিকাও ইরানি বন্দরগুলোতে পাল্টা অবরোধ জারি করেছে। ট্রাম্প বারবার চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কথা বললেও, আদতে পরিস্থিতি যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়- এমন এক গোলকধাঁধায় আটকে আছে।
বিদেশ নীতি নিয়ে সাধারণত মার্কিন ভোটাররা খুব একটা মাথা না ঘামালেও, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ধাক্কা সরাসরি গিয়ে লেগেছে তাদের মানিব্যাগে। জ্বালানির দাম বাড়ায় আমেরিকার বাজারে মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছেছে। ‘ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর জরিপ বলছে, ৭৯ শতাংশ মার্কিন ভোটার স্পষ্ট বুঝতে পারছেন, এই যুদ্ধের কারণেই তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ফলে এটি এখন আর সুদূর সাগরের ওপারের কোনো যুদ্ধ নয়, বরং মার্কিনিদের ঘরের ভেতরের অর্থনৈতিক সংকট।