উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তোফায়েল আহমেদ আর নেই। সোমবার বিকেলে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হলো।
ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রেখেছিলেন তরুণ তোফায়েল আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতা ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি পান। এরপর মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন এবং দেশের রাজনীতির নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্বাচন, দলীয় নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দায়িত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থেকেছেন আওয়ামী লীগের এ বর্ষীয়ান নেতা।
তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের বাকেরগঞ্জ জেলার কোড়ালিয়া গ্রামে (বর্তমান বাংলাদেশের ভোলা জেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নে)। তার বাবার নাম মৌলভী আজহার আলী ও মা ফাতেমা বেগম।
ভোলার প্রত্যন্ত জনপদ থেকে শুরু হয়েছিল তোফায়েল আহমেদের শিক্ষাজীবন। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬২ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়টিই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদের হাতেখড়ি হয় ছাত্রলীগের মাধ্যমে। পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার ভিত্তি নির্মাণ।
১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত সহ-সভাপতি (ভিপি) ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৬৮-৬৯-এ গণজাগরণ ও ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন তিনি ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল আসামিকে মুক্তি দেয় পাকিস্তান সরকার। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ওই বছরেরই ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান) এক সভার আয়োজন করে। লাখো জনতার অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সম্মেলনে শেখ মুজিবকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আর উপাধি প্রদানের সেই ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ।
এরপর রাজনীতিই হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রধান পথচলা। ছাত্র আন্দোলনের রাজপথ থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত ধাপে ধাপে নিজের অবস্থান গড়ে তোলেন তিনি।
প্রথমবারের মতো ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয় লাভ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন।
দেশ স্বাধীনের পরের বছর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন।
রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সাল থেকে টানা ৩৩ মাসসহ অসংখ্যবার কারাভোগও করেন এই নেতা।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নিজের জেলা ভোলা থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন।
১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তিনি শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে ২০১৩-১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন।
রাজনৈতিক জীবনের শেষভাগে তিনি নানা চড়াই-উতরাইয়েরও মুখোমুখি হন। ২০০৭ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারির পর, তোফায়েল আহমেদ সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তাবিত আওয়ামী লীগের সংস্কার পরিকল্পনার পক্ষে মত দেন, যেখানে দলীয় প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাকে অপসারণ করার প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যা দলীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। এর ফলে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, তবে প্রেসিডিয়ামের প্রভাবশালী সদস্যদের একজন হওয়া সত্ত্বেও তোফায়েল আহমেদ মন্ত্রিসভা থেকে বাদ যান।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের রাজপথ থেকে জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পর্যায়—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তোফায়েল আহমেদের নাম। ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা হয়ে ওঠা এই রাজনীতিকের দীর্ঘ পথচলা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।



বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন