নেইমার জুনিয়রের জন্য এবারের বিশ্বকাপ কোনো নতুন শুরুর গল্প নয়, বরং এটি তাঁর ক্যারিয়ারের রাজকীয় মঞ্চ থেকে বিদায়ের শেষ রাগিণী। ক্যারিয়ারজুড়ে একদিকে যেমন ছিল অতিমানবীয় পায়ের জাদু, অন্যদিকে তেমনই ছিল চোটের নিষ্ঠুর আঘাত আর একগাদা বিতর্ক।
৩৪ বছর বয়সী ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর জাতীয় দলে ফিরিয়ে এনেছেন কোচ কার্লো আঞ্চেলত্তি। তবে গত সপ্তাহে দলের প্রথম অনুশীলন সেশনেই তিনি ছিলেন অনুপস্থিত; স্ক্যান রিপোর্টে ধরা পড়েছে নতুন এক কাফ ইনজুরি, যা বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে তাঁর মাঠে নামা নিয়ে আবারও বড়সড় শঙ্কার মেঘ তৈরি করেছে।

জাতীয় দলের জার্সিতে নেইমারকে শেষবার দেখা গিয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে এক বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে। সেই অভিশপ্ত রাতে হাঁটুর মারাত্মক ইনজুরিতে পড়ার পর থেকে দীর্ঘ ৬০০ দিনেরও বেশি সময় মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে তাঁকে।
সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলাল হয়ে নিজের শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরেও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি; বরং নতুন চোট আর মাঠের বাইরের বিতর্কই তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়েছে। চলতি বছরে ১৫ ম্যাচে ৬টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করলেও, গত ফেব্রুয়ারিতে আবারও হাঁটুর অস্ত্রোপচারের পর থেকে তাঁকে অত্যন্ত সাবধানে খেলানো হয়েছে; কোনোবারই টানা ৪টির বেশি ম্যাচে মাঠে নামেননি তিনি।

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নেইমারের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দেশটিতে এখন তুমুল বিতর্ক। গত ১৮ মে রিও ডি জেনিরোর ‘মিউজিয়াম অব টুমরো’-তে কোচ আনচেলত্তি যখন স্কোয়াড ঘোষণা করতে মঞ্চে ওঠেন, তখন হলরুমজুড়ে টানটান উত্তেজনা। যেই মুহূর্তে নেইমারের নাম ঘোষণা করা হলো, পুরো মিলনায়তন যেন এক শেষ মিনিটের গোলের আনন্দে ফেটে পড়ল।
গত শনিবার আনচেলত্তি আশাবাদ জানিয়ে বলেন, ১৩ জুন মরক্কোর বিরুদ্ধে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচের আগেই নেইমার পুরোপুরি ফিট হয়ে উঠবেন। তীব্র গতি আর হাই-প্রেসিং ফুটবলের দল গড়া এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড আসলে যুক্তির চেয়ে কিছুটা ‘আবেগ’ বা রোমান্সকে প্রাধান্য দিয়েই সেলেসাওদের চিরচেনা এই তিলককে দলে টেনেছেন।
দলের সতীর্থরা প্রকাশ্যে নেইমারকে স্বাগত জানালেও, সমর্থকরা এখনো দ্বিধাবিভক্ত, নেইমারের জাদুকরী মস্তিষ্ককে তাঁর এই ভঙ্গুর শরীর আর সঙ্গ দেবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই।

এটি হতে যাচ্ছে নেইমারের চতুর্থ বিশ্বকাপ, যে টুর্নামেন্টটি বরাবরই তাঁর ক্যারিয়ারের ট্র্যাজেডির সমার্থক। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে ৫ ম্যাচে ৪ গোল করার পর কলম্বিয়ার ডিফেন্ডারের ধাক্কায় পিঠের হাড় ভেঙে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যান তিনি; আর ব্রাজিলকে হজম করতে হয় জার্মানির কাছে ১-৭ গোলের ঐতিহাসিক লজ্জা।
২০১৮ সালে পিএসজি’র হয়ে খেলার সময় পায়ের চোটে ভুগে বিশ্বকাপে এসে বেলজিয়ামের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নিতে হয়। ২০২২ সালে দুর্দান্ত ফর্মে থেকে কাতারে এলেও, সার্বিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই গোড়ালির ইনজুরিতে পড়েন; পরে কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে গোল করেও পেনাল্টি শুটআউটে অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় নিতে হয় তাঁকে।
বর্তমানে নিজের সেরা ফর্ম থেকে অনেক দূরে থাকা নেইমার কোচ আনচেলত্তির কৌশলের সাথে কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন, তা নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে। মে মাসের শুরুতে রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আঞ্চেলত্তি জানিয়েছিলেন, তাঁর দলকে মাঝমাঠ থেকে অনবরত দৌড়ে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরতে হবে। নিজের আত্মবিশ্বাস ও শরীরকে জোড়াতালি দেয়া একজন খেলোয়াড়ের জন্য এই রণকৌশল অত্যন্ত কঠিন ও দাবিদার।
তবে মাঠের মূল সেনানায়ক হিসেবে খেলুন কিংবা দলের ড্রেসিংরুমের মানসিক শক্তির উৎস হিসেবে, নেইমারের উপস্থিতিই ব্রাজিলের আবহ বদলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। ভালো কিংবা মন্দ, এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের মিশন আরও একবার লিজেন্ডারি নম্বর ‘১০’ জার্সির নামেই লেখা থাকবে।