ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ! ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে প্রথমবারের মতো ‘হোয়াইটওয়াশ’ করার গৌরব অর্জন করেছে টাইগাররা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এটি একটি স্মরণীয় মুহূর্ত এবং এক নতুন দিগন্তের সূচনা। পুরো প্রতিযোগিতা জুড়েই নিজেদের চাঙ্গা ভাব ও খেলার গতি এতোটুকুও কমতে দেয়নি বাংলাদেশ দল; যার ফলশ্রুতিতে এসেছে এই দারুণ কৃতিত্ব। আর শান্তরা সিরিজ জিতলো ২-০ ব্যবধানে।
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য কিছুটা বিপাকে পড়েছিলো বাংলাদেশ। মেঘলা আকাশের নিচে প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে একপর্যায়ে মাত্র ১১৬ রানেই ছয় উইকেট হারিয়ে বসে তারা। তবে সেই চরম চাপের মুখে দাঁড়িয়ে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি করে দলকে বড়ো বিপদ থেকে টেনে তোলেন লিটন দাস। এরপর বাংলাদেশের বোলাররা দেখান তাদের ধারালো ও আক্রমণাত্মক বোলিং। বোলারদের দারুণ নৈপুণ্যে প্রথম ইনিংসে ৪৬ রানের একটি গুরুত্বপূর্ণ লিড পায় স্বাগতিকরা।
ম্যাচ যতো গড়িয়েছে, পিচের আচরণ ততোটাই সহজ হয়েছে। আর এই সুযোগটি পুরোপুরি লুফে নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে রানের পাহাড় গড়ে বাংলাদেশ। টপ অর্ডারে মাহমুদুল হাসানের হাফ সেঞ্চুরি, মুশফিকুর রহিমের এক অসাধারণ সেঞ্চুরি এবং লোয়ার অর্ডারে লিটনের আরও একটি হাফ সেঞ্চুরির ওপর ভর করে পাকিস্তানের সামনে ৪৩৭ রানের এক বিশাল লক্ষ্য গড়ে দেয় স্বাগতিকরা।
বিশাল রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান অবশ্য লড়াই করার চেষ্টা করেছিলো। ম্যাচে কিছু মুহূর্ত তাদের পক্ষেও এসেছিলো। কিন্তু পাহাড়সম এই লক্ষ্য পার হওয়া তাদের জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন এক কাজ, যার ফলে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য থেকে দূরেই থেমে যেতে হয় তাদের। দ্বিতীয় ইনিংসে মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সালমান আলী আগার মধ্যকার ১৩৪ রানের জুটি এবং পরবর্তীতে রিজওয়ান ও সাজিদ খানের ইতিবাচক ও আগ্রাসী ব্যাটিং পাকিস্তানকে কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছিল। তবে জয়ের জন্য লক্ষ্যটি এতোটাই বড়ো ছিল যে, তা টপকানো পাকিস্তানের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
শেষ ইনিংসে বল হাতে একাই সব আলো কেড়ে নেন তাইজুল ইসলাম। দুর্দান্ত বোলিংয়ে তিনি একাই শিকার করেন ছয়টি উইকেট। ম্যাচের শেষ উইকেটটিও আসে তার হাত ধরেই, জয় আসে ৭৮ রানে। যা পুরো বাংলাদেশ দলকে বন্য উল্লাসে ভাসিয়ে দেয়।
প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হয়েছেন লিটন কুমার দাস। আর প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ নির্বাচিত হয়েছেন মুশফিকুর রহিম।
ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতার পর লিটন দাস জানান, আগের দুই ইনিংসে রান না পাওয়ায় উইকেটে যাওয়ার সময় বড়ো স্কোর করার বাড়তি কোনো চাপ তার ওপর ছিলো না, তবে দ্রুত দুটি উইকেট পড়ে যাওয়ায় কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যান। সেই মুহূর্তে অধিনায়ক শান্তর কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি আক্রমণাত্মক খেলে রান তোলার তাগিদ দেন। অধিনায়কের কথামতো নিজের শক্তির ওপর ভরসা রেখে দুটি বাউন্ডারি মারার পরই লিটন উপলব্ধি করেন যে এটি টেস্ট ক্রিকেট এবং বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় তাকে আরও অন্তত ১০ থেকে ১৫ ওভার ক্রিজে টিকে থাকতে হবে।
টেল-এন্ডারদের ব্যাটিংয়ের সুযোগ না দিয়ে সিঙ্গেল নিতে অস্বীকার করার কৌশল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের স্ট্রাইক দিলে হয়তো তার নিজের স্কোর ৫০ রানেই থেমে যেতো; তাই প্রতিপক্ষ ফিল্ডাররা সীমানায় থাকা সত্ত্বেও নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে এবং দলের রান বাড়াতে তিনি নিজেই বেশি বল খেলার ও টেলএন্ডের ব্যাটসম্যানদের আগলে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম দিনের ধীরগতির আউটফিল্ড ও কঠিন উইকেটে টেল-এন্ডারদের নিয়ে খেলা এই ইনিংসটিকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা শতক হিসেবেই দেখছেন লিটন।
সিরিজ সেরার পুরস্কার জেতার পর মুশফিকুর রহিম এই জয়কে অনেক বড়ো অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি। জানান, গত দুই-তিন বছর ধরে বিশেষ করে টেস্ট ফরম্যাটে দলের ছেলেরা যেভাবে খেলছে, সেই অনুযায়ী এই কৃতিত্ব তাদের পুরোপুরি প্রাপ্য। নিজের সেঞ্চুরির চেয়েও প্রথম ইনিংসে লিটন দাসের অসাধারণ ইনিংসটিকে এগিয়ে রেখে মুশফিক বলেন, লিটনের সেই ব্যাটিংই মূলত বাংলাদেশকে খেলায় টিকিয়ে রেখেছিলো এবং দলের মনোবল বৃদ্ধিও এর পেছনে বড়ো ভূমিকা রেখেছে। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ের জন্য উইকেট বেশ ভালো থাকায় অন্তত ৪০০ বা সাড়ে চারশর বেশি রান করার প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিলো উল্লেখ করে তিনি বোলারদেরও প্রশংসায় ভাসান, যারা পঞ্চম দিনের উইকেটের ভরসায় না থেকে নিজেদের মৌলিক বোলিং ধরে রেখেছিলেন। নিজের দীর্ঘ পথচলার অনুপ্রেরণা প্রসঙ্গে মুশফিক জানান, দেশের হয়ে খেলতে পারাই তার কাছে সবচেয়ে বড়ো আনন্দের বিষয়, কারণ যারা বাংলাদেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখে, তাদের সবাই সহজে এই সুযোগ পায় না; এর জন্য কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে হয়। তাই মাঠে নেমে নিজের কাজটা করে যেতে পেরে এবং এই জীবনকে উপভোগ করতে পেরে তিনি সর্বশক্তিমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদ বলেন, আগের ইনিংসে করা ভুলের কারণেই মূলত লক্ষ্যটা এতো বড় হয়ে গিয়েছিলো এবং ম্যাচটি হাতছাড়া হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে ১১৬ রানে ছয় উইকেট ফেলে দেওয়ার পরও সুযোগ হাতছাড়া করায় তাদের শেষ চার উইকেট অনেক রান তুলে নেয়, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একইভাবে পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রেও যখন দল ১৪২ রানে চার উইকেট নিয়ে ভালো অবস্থানে ছিলো এবং দুজন সেট ব্যাটসম্যান ক্রিজে ছিলেন, তখন টেস্ট ক্রিকেটের নিয়ম অনুযায়ী বড়ো স্কোর গড়তে না পারাকে তিনি ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।
শান মাসুদ বলেন, টেস্ট ক্রিকেট অত্যন্ত ক্ষমাহীন এবং এখানে যেকোনো ভুলের জন্যই কঠিন শাস্তি পেতে হয়। তার মতে, হাতেগোনা দু-একটি ম্যাচ ছাড়া বাকি প্রতিটিতেই পাকিস্তান দল ভালো অবস্থানে গিয়েও শেষ পর্যন্ত বল হাতে কিংবা ফিল্ডিংয়ের ব্যর্থতায় ম্যাচ শেষ করতে পারেনি। তাই টেস্ট ক্রিকেটে টিকে থাকতে হলে কোনো সহজ ম্যাচ আশা না করে, পুরো পাঁচ দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা এই দলের শেখাটা বড্ড প্রয়োজন।
ম্যাচ বিশ্লেষকরা বলেন, লাল বলের ক্রিকেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে একসময় যেখানে বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হতো, সেখানে এখন টানা চারটি টেস্ট জয়ের এক অবিশ্বাস্য নজির গড়েছে তারা। এর আগে পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে তাদেরকে প্রথমবার ২–০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করার পর, এবার নিজেদের চেনা মাঠেও সেই একই দাপট ধরে রেখে আরও একটি হোয়াইটওয়াশ সম্পন্ন করল টাইগাররা। বিশেষ করে খেলার সবচেয়ে কঠিন ফরম্যাটে বাংলাদেশ দলের এই অভাবনীয় সাফল্য এটাই প্রমাণ করে যে, ক্রিকেটের দীর্ঘতম সংস্করণে তারা কতটা উন্নতি করেছে। মূলত দলের নিখুঁত অলরাউন্ড ভারসাম্যই পরিচিত পরিবেশে বাংলাদেশকে এমন দ্রুত এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে। অন্যদিকে, এই সিরিজে পাকিস্তানের এমন ভরাডুবির পেছনে বড় কারণ ছিল তাদের ব্যাটিং ধস। টেস্ট ক্রিকেটের মতো অভিজাত সংস্করণে যেকোনো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোটা ভীষণ জরুরি, আর সফরকারী পাকিস্তান দল ঠিক সেই জায়গাটিতেই বারবার পিছিয়ে পড়েছে।