জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বহিরাগত কর্তৃক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে শিক্ষার্থীদের বেধে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলমের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে উপাচার্যের (ভিসি) বাসভবনের সামনে রাতভর অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টারজান চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। মিছিলটি ছাত্রীদের আবাসিক হল হয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়৷ পরে সেখানে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলমসহ পুরো প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগের জোর দাবি জানান।
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন এলাকায় এক নারী শিক্ষার্থীকে রাস্তা থেকে টেনে নিয়ে পাশের জঙ্গলে ধর্ষণচেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় বুধবার অজ্ঞাতদের আসামি করে আশুলিয়া থানায় মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সেদিন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের জন্য সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সময় বেঁধে (আল্টিমেটাম) দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। নির্দিষ্ট সময়ে গ্রেপ্তারে ব্যর্থ হলে প্রক্টরের পদত্যাগের দাবি জানান তারা।
দাবিগুলো হলো—অপরাধীকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে; যদি এ দাবি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যর্থ হয়, তাহলে ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায় স্বীকারপূর্বক প্রক্টরিয়াল বডিকে পদত্যাগ করতে হবে; হেনস্তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে; ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দিয়ে তাদের কুইক রেসপন্স টিমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা ও পূর্বের বিভিন্ন ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হওয়া প্রক্টর স্ব পদে বহাল থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, ‘রাত ১০টার দিকে তারামন বিবি হলের গেস্টরুমে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন হল ও অনুষদের আমরা শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়েছি। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নারী শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনায় আমাদের মধ্যে চলমান পরিস্থিতি, নিরাপত্তা সংকট এবং তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে কথা হয়। গত প্রায় দুই বছরে ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রক্টরিয়াল বডির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ কারণে প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগের দাবিতেও সবাই একমত হয়েছেন।’
অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে রাত আড়াইটার দিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান৷ এসময় ক্যাম্পাসে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় প্রক্টরের দাবি জানানো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উপাচার্যের বাগবিতণ্ডা হতে দেখা যায়।
উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কোনো শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে তা প্রক্টরিয়াল বডি দেখভাল করে। তবে বহিরাগত কেউ অপরাধ করলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় এবং সেটি মূলত পুলিশের এক্তিয়ারভুক্ত।
উপাচার্যের এমন মন্তব্যে তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা৷ শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে উপাচার্য জানান, সবকিছুর নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে৷ এভাবে বাসভবনের সামনে প্রক্টরের পদত্যাগ হয় না৷ এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনকালে প্রক্টরিয়াল বডির কোনো গাফিলতি আছে কিনা তা তদন্ত কমিটি করে খতিয়ে দেখা হবে৷
তবে উপাচার্যের এমন প্রস্তাব প্রত্যাখান করে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।