ভারতের বিহারে গঙ্গার পানি বাড়ায় ফারাক্কা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে এ অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেছেন, গঙ্গার পানির প্রবাহ বাড়লে বিহারের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সম্রাট চৌধুরী জানান, বিহারে গঙ্গার পানি দ্রুত বাড়ছে এবং বন্যা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। এ অবস্থায় ফারাক্কা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দিয়েছেন বলেও জানান সম্রাট চৌধুরী।
ফারাক্কার গেট খোলার সম্ভাবনায় বাংলাদেশে উজানের পানি ও বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দেশের সীমান্তবর্তী ও নিম্নাঞ্চলে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী তিন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। মোগড়া, দক্ষিণ ও মনিয়ন্দ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ২৫০ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েকটি গ্রামের বহু পরিবার।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পানি বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকার কয়েকটি বিদ্যালয়কে সম্ভাব্য আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ত্রাণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
হবিগঞ্জেও উজানের পানিতে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ বাঁধে প্রায় দেড় মাস পর আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
প্রবল স্রোতে পানি লোকালয়ে ঢুকে রাস্তা, ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয়রা জানান, দেড় মাস আগে একই বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই আবার বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন তারা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রোববার সকালে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে কালীগঞ্জ বাঁধ ভেঙে নদীর পানি দ্রুত লোকালয়ে ঢুকে পড়ে।
এর মধ্যে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবেও দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জারি রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ, সংলগ্ন উত্তর ওড়িশা এবং উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করছে।
এর প্রভাবে সমুদ্রবন্দর, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ফারাক্কা ব্যারাজ ও গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ১৯৯৬ সালের ভারত-বাংলাদেশ চুক্তির বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভারতের জনতা দল (ইউনাইটেড) বা জেডিইউয়ের রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় ঝা বলেছেন, চুক্তিটি নবায়নের আগে বিহারের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরে চুক্তিটির ৩০ বছর পূর্ণ হবে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন নদী রয়েছে ৫৪টি। এর মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন ১৯৯৬ সালের চুক্তির আওতাভুক্ত। ফারাক্কা ব্যারাজকে কেন্দ্র করে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি বণ্টনের বিষয়টি এই চুক্তিতে নির্ধারিত হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে ভারতের বিহারে বন্যার আশঙ্কা, অন্যদিকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় উজানের ঢল এবং বাঁধ ভেঙে প্লাবনের ঘটনা—সব মিলিয়ে পানি পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফারাক্কার গেট খোলার বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত কী হয় এবং এর ফলে বাংলাদেশে নদ-নদীর পানি প্রবাহে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।